ইসলাম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ইসলাম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আদর্শ নানা হিসেবে আল্লাহর রাসূল
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন একজন আদর্শ নানা। তিনি তার ছোট নাতি ও নাতনিদের খুব আদর করতেন।
বিস্তারিত পড়ূনঃ আদর্শ নানা হিসেবে আল্লাহর রাসূল
আদর্শ স্বামী হিসেবে আল্লাহর রাসূল
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন একজন আদর্শ স্বামী। তার একাধিক স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন তার স্ত্রীদের নিকট খুব প্রিয়। তিনি তার স্ত্রীদের সাথে ভালো ব্যবহার করতেন, খেলা-ধুলা করতেন, তাদের চাহিদাগুলো পূরণ করতেন, তারা কোনো কিছু চাইলে তাতে কোনো কার্পণ্য করতেন না। তাদের অধিকার সম্পর্কে তিনি অত্যন্ত সচেতন ছিলেন।
বিস্তারিতঃ আদর্শ স্বামী হিসেবে আল্লাহর রাসূল
গোসল করার মাসআলা মাসায়েল
গোসল পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার ও স্বাস্থ্য সুস্থতার অবিচ্ছেদ অংশ। নিয়মিত গোসল না করলে স্বাস্থ্যের রং পরিবর্তন হয়ে যায়। অন্যান্য ধর্মের গোসল সম্পর্কে তেমন বিধি-বিধান না থাকলেও ইসলাম ধর্মে রয়েছে নানান বিধি-বিধান। মুসলিম নারী পুরুষের গোসল কে কয়েক ভাগে ভাগ করা হয়েছে। কি কারণে কি ধরণের গোসল করতে হয় জানুন সেসব তথ্য ও গোসলের নানান মাসআলা মাসায়েল।
পড়া শুরু করতে ক্লিক করুন : মুসলিম নারী পুরুষের গোসল করার মাসআলা মাসায়েল।
পড়া শুরু করতে ক্লিক করুন : মুসলিম নারী পুরুষের গোসল করার মাসআলা মাসায়েল।
প্রশ্নঃ রোযাদার ব্যক্তি যদি হস্তমৈথুন করলে কি রোযা ভেঙ্গে যাবে?
Download bangla islamic song mp3
ডাউনলোড করুণ আপনার প্রিয় ইসলামি সঙ্গীত হামদ-নাত। বাংলা ইসলামী ও গজল সঙ্গীতের বিশাল সংগ্রহ। ইসলামী সঙ্গীত কলরব, bangla islamic song mp3, bangla islamic song
লেংটা হয়ে গোসল করা কি জায়েয?
প্রশ্নঃ সাহু সিজদা কাকে বলে? কখন করতে হয় ও কিভাবে করতে হয় এবং কেন করতে হয় বিস্তারিত জানতে চায়?
ইসলামে স্ত্রীর মাসিকের সময় সহবাস করার বিধান
প্রশ্নঃ নখ পালিশ ব্যবহার করে ওযু করার বিধান কি?
রমজানের দিনের বেলা ইচ্ছাকৃতভাবে বীর্যপাত ঘটালে কী হবে?
নিজ স্ত্রী ব্যতীত অন্য কোন ভাবে বীর্যপাত করা হারাম। আল্লাহ রাববুল আলামীন বলেন : وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ ﴿5﴾ إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ ﴿6﴾فَمَنِ ابْتَغَى وَرَاءَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْعَادُونَ ﴿7﴾ (المؤمنون: 5-7) ‘‘(মুমিন তারা) যারা নিজেদের যৌন অঙ্গকে সংযত রাখে। নিজেদের স্ত্রী অথবা অধিকারভুক্ত দাসীগণ ব্যতীত। এতে তারা নিন্দনীয় হবে না। এদের ছাড়া অন্য কিছু কামনা করলে তারা সীমা লঙ্ঘন কারী হবে।’’ সূরা আল- মুমেনুন : ৫-৬ আর এ ধরনের কাজে শরীরেরও ক্ষতি। রমজানের দিনের বেলা কোন সাওম পালনকারী যদি এ ধরনের কাজ ইচ্ছাকৃত ভাবে করে ফেলে তাহলে সে গুনাহগার হবে। তার ঐ দিনের সাওম কাজা করতে হবে। কারণ বীর্যপাত করা সহবাসের মতই। বুখারীতে এসেছে আয়েশা (রা:) বলেনে : كان رسول صلى الله عليه وسلم يقبل وهو صائم، وكان أملككم لإربه. ‘‘আল্লাহর রাসূল [সা.] সাওম অবস্থায় স্ত্রীকে চুমো দিতেন। কিন্তু তিনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে সামর্থ্য ছিলেন।’’ একথার দ্বারা বুঝে আসে যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না রমজানের দিনের বেলা সাওম অবস্থায় তার চুমো দেয়া জায়েয নেই। চুমো দিতে যেয়ে কামাবেগে যদি বীর্যপাত হয়ে যায় তাহলে সাওম নষ্ট হয়ে যাবে। তবে কাফ্ফারা আদায় করতে হবে না। কাজা আদায় ও তওবা করতে হবে। যার উপর সাওমের কাজা ওয়াজিব সে পরবর্তী রমজান আসার আগে যদি কাজা আদায় না করে তবে তার এ অলসতার জন্য তওবা ইস্তিগফার করতে হবে, কাজা আদায় করতে হবে ও প্রতিটি সাওমের পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাদ্য দান করতে হবে। সাহাবায়ে কেরামের এক জামাত এ ফতওয়া দিয়েছেন। একটি সাওমের কাফ্ফারা হল অর্ধ সা খাদ্য যা বর্তমানে প্রায় এক কেজি পাঁচশো গ্রাম পরিমাণ হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক জ্ঞাত।
ইসলাম বিরোধিতাই প্রগতিশীলতা নয়
ইসলাম বিরোধিতাই প্রগতিশীলতা নয়
ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী
সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি, ২০১৪

‘প্রগতিশীল’ বলতে আমরা কী বুঝব? ‘ইসলাম বিরোধিতা’ই কি প্রগতিশীলতা? ইসলাম ধর্ম এবং মহানবীকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা এবং মুসলমান পরিচয় যথাসম্ভব লুকিয়ে রাখাই কি আধুনিক ও প্রগতিশীল মননের পরিচায়ক?
‘ধর্মান্ধতা’ যেমন সমাজকে কুসংস্কার, অদৃষ্টবাদ ও অতীতচারিতায় আবদ্ধ করে স্থবির করে রাখে, তেমনি ‘অতি-প্রগতিশীল’ হতে গিয়ে ‘ধর্মবিদ্বেষী’ হয়ে ওঠাও কল্যাণ বয়ে আনে না। আমাদের জাতি গঠনের পথে তা বিরাট অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। অবশ্য কেউ যদি মনে করেন ‘জাতি’ থাকবে কেন, আমরা তো ‘আন্তর্জাতিকতা’য় বিশ্বাসী; অথবা মনে করেন, সারা দুনিয়ার সব জাতি বা রাষ্ট্রের সীমানা তুলে দিয়ে একক বিশ্বমানবতার বিজয় কেতন ওড়ানোর জন্যই আমাদের সংগ্রাম; তাহলে বলার কিছু থাকে না। কিন্তু যদি আমরা বর্তমানকালের ‘জাতি-রাষ্ট্র’ভিত্তিক বিশ্ব সমাজকে নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই, তাহলে অংকটা ভিন্নতর হতে হবে।
একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, ‘বিশ্বায়নে’র উচ্চকিত স্লোগান সত্ত্বেও আজকের দিনে বিভিন্ন জাতি-রাষ্ট্রের সীমান্ত প্রহরা ক্রমেই নিশ্ছিদ্র হয়ে উঠছে। জাতি-রাষ্ট্রের বিভাজন ও সীমান্ত রেখার এ নিশ্ছিদ্রকরণ বিশ্বমানবতার দৃষ্টিকোণ থেকে নেতিবাচক মনে হতে পারে, তবে ভূপৃষ্ঠের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণ, সামাজিক শৃংখলা প্রবর্তন এবং ব্যক্তির জাগতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনে ‘জাতি-রাষ্ট্র’গুলোকে যথাসম্ভব স্বনির্ভর ও সক্ষম করে তোলার বিকল্প নেই। ভূমি ও জনশক্তির ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকেও তা অপরিহার্য। এ অপরিহার্যতা আরও বেড়ে যায় যখন সীমিত সম্পদের সুষম বণ্টন এবং শক্তিমান জনগোষ্ঠী কর্তৃক দুর্বলতর জনগোষ্ঠীর সম্পদ লুণ্ঠনের অব্যাহত প্রক্রিয়া প্রতিহত করার বিষয়টি সামনে চলে আসে।
গত দুই দশকের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, কথিত ‘বিশ্বায়ন’ এবং তা থেকে উৎসারিত ‘মুক্তবাজার’ সবার জন্য পথচলা সমভাবে উন্মুক্ত করে না। এই ‘মুক্ত’ বাজারে মুষ্টিমেয় শক্তিমানের বিশ্বময় দাপিয়ে বেড়ানোর সুযোগ অবারিত হয়েছে বটে, কিন্তু তার বিপরীতে দুর্বলতর মানুষকে শক্তিমানের মাটিতে অন্তর্বাস খুলে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে (অতি সম্প্রতি এক ভারতীয় কূটনীতিকের দূরবস্থার বিষয়টি স্মর্তব্য)। এ অসম আদান-প্রদানকে ‘বিশ্বায়ন’ বলা পরিহাস ছাড়া আর কিছুই নয়। বাণিজ্য-উদ্বৃত্তের একমুখী প্রবাহকে ‘মুক্তবাজার’ আখ্যা দেয়াও সঠিক শব্দচয়ন নয়।
এ ‘বিশ্বায়ন’ ও ‘মুক্তবাজারে’র শেষ গন্তব্য পশ্চিমের কয়েকটি ধনকুবের দেশ। যাদের ধনের উৎস অতীতের সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক শাসন। তারই নতুন সংস্করণ এই ‘বিশ্বায়ন’ ও ‘মুক্তবাজার’। যার সুরক্ষায় উদ্ভাবিত হয়েছে একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতির নয়া মূলমন্ত্র- ‘সভ্যতার সংঘাত’ (Clash of civilization)-এর সভ্যতাবিনাশী তত্ত্ব। মার্কিন নব্য-রক্ষণশীলতার (Neo-con) এ প্রেসক্রিপশন মেনে নিয়েই নির্ধারিত হয়েছে পশ্চিমা শক্তির নয়া রণকৌশল।
Clash of civilization তত্ত্বের উদ্গাতা হান্টিংটন একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বকে দেখেছেন ‘পশ্চিমা সভ্যতা’র বিপরীতে ‘ইসলামী সভ্যতা’র নিরবচ্ছিন্ন লড়াই হিসেবে। এ লড়াইয়ে তিনি চীনকে দেখেছেন সরাসরি ইসলামী সভ্যতার মিত্র হিসেবে। আর রাশিয়া (অর্থডক্স ক্রিশ্চিয়ানিটি) এবং ভারতকে রেখেছেন দুয়ের বাইরে ধূসর অবস্থানে। ১৯৯০ সালের দিকে প্রথম প্রচারিত এ তত্ত্বেরই আক্ষরিক প্রয়োগ দেখা গেছে বিগত দুই দশকে পশ্চিমা কূটনীতি ও রণনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে। যার প্রয়োগ শুরু হয়েছে ইরাককে দিয়ে। অতঃপর আফগানিস্তান, লিবিয়া, মিসর, সিরিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়া, পাকিস্তান- একে একে গোটা মুসলিম বিশ্ব। এক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বা ইউরোপের দেশগুলোতে কোন দল বা কোন ক্ষমতাধর নেতা ক্ষমতায় থাকছেন তাতে হেরফের ঘটছে না।
আমাদের রাজনীতিতেও কি এর প্রভাব পড়ছে?
ইসলামের বিরুদ্ধে পশ্চিমের এ ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ প্রধানত মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকাকে লক্ষ্য করে শুরু হলেও দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াও তার বাইরে আছে বলে মনে হয় না। সম্ভবত পশ্চিমকে সতর্ক করে দিতেই হান্টিংটন চীনকে ইসলামী সভ্যতার মিত্র এবং ভারতকে ‘গ্রে এরিয়া’ হিসেবে অনিশ্চিত অবস্থানে রেখেছেন। তাই পশ্চিমের তীক্ষè দৃষ্টি এখন এ দুটি দেশের দিকে। এ দুই দেশের সঙ্গে পশ্চিমের সম্পর্কের টানাপোড়েনে তার প্রতিফলন স্পষ্ট। এ দুই উদীয়মান পরাশক্তিকে ইসলাম ও মুসলমান থেকে দূরে সরিয়ে রাখা এখন যেন পশ্চিমের রণকৌশলের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে আছে। যার প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতেও পড়ছে বলে মনে হয়।
বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কোনো অর্থেই ইসলামবিরোধী দল নয়। অতীতে মার্ক্সবাদী রাজনীতি করেছেন এমন বেশ কিছু রাজনীতিক ও তাদের অনুসারীরা এ দলে যোগ দিয়েছেন। ধর্ম বিষয়ে তাদের কিছুটা উদাসীন থাকা অস্বাভাবিক নয়। তবে মূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা ব্যক্তি জীবনে তাদের ধর্মীয় পরিচয় দৃঢ়তার সঙ্গেই ধারণ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই তার দৃষ্টান্ত। রাজনীতিতে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র কথা জোরেশোরে বললেও।
কিন্তু আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বলয়ে অবস্থানকারী কিছু কিছু গোষ্ঠীর ‘ইসলাম বিদ্বেষ’ মোটেই অস্পষ্ট নয়। কেবল তা-ই নয়, এ দেশের ধর্মীয় ও নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোকে নিয়ে তাদের নানাবিধ রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মসূচি ও বক্তব্য অনেক ক্ষেত্রে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আহত করে। যার মাশুল দিতে হয় আওয়ামী লীগকেই।
মৌলবাদী ধর্মাচার যারা পালন করেন না, এমনকি যারা ধর্মহীন জীবন দর্শনের অনুসারী, তাদের দিক থেকেও মুসলমান বা ইসলামের সঙ্গে অযথা সাংঘর্ষিক অবস্থান তৈরি করা রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী। এর ফলে এ ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে কেবল যে সংশ্লিষ্ট দল-উপদল সম্পর্কে জনমনে বিরূপ মনোভাব গড়ে ওঠে তা-ই নয়, এ অপরিণামদর্শিতা দেশে কট্টর মৌলবাদের ভিত প্রসারিত করে। যা পরিণামে তথাকথিত ধর্মীয় ‘জঙ্গিবাদ’ বা ‘সন্ত্রাসবাদ’কে উস্কে দিয়ে হিতে বিপরীত ঘটাতে পারে।
বাংলাদেশে এখন সেই পরিস্থিতিই বিরাজ করছে।
‘ধর্মান্ধতা’ বনাম ‘ধর্মবিদ্বেষ’
এখন বাংলাদেশে একদিকে কট্টর ‘ধর্মান্ধতা’ এবং অপরদিকে চরম ‘ধর্মবিদ্বেষ’ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। এ ধর্মবিদ্বেষ কার্যক্ষেত্রে আবার শুধু ‘ইসলাম বিদ্বেষ’ (অন্য কোনো ধর্ম নয়)। আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছু দল-উপদল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের পাশ কাটিয়ে ‘সংখ্যালঘু রাজনীতি’র চর্চায় অনেক সময় ও শ্রম বিনিয়োগ করে থাকে। সংখ্যালঘুদের প্রতি সংবেদনশীল থাকা এবং তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার সংরক্ষণে সচেতন থাকা অবশ্যই উন্নত মনমানসিকতার পরিচায়ক। তবে জাতীয় রাজনীতিতে কোনো অর্থবহ অবদান রাখতে হলে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর চিন্তা-ভাবনা, পছন্দ-অপছন্দকে মূল্য দেয়া জরুরি। তাছাড়া কেউ যদি হতদরিদ্র মানুষের জন্য কাজ করতে চান, তাহলেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর হতদরিদ্র মানুষের কথা ভুলে থাকলে চলবে কেন? সারা দেশের কথা থাক, শুধু এ ঢাকা শহরে যতজন মানুষ ফুটপাতে বা বস্তিতে অবাসযোগ্য পরিবেশে অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবনযাপন করে, তাদের সংখ্যা সম্ভবত সারা দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সব মানুষের সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে। হতদরিদ্র মানুষ হিসেবে তাদেরও হিসাবে নিতে হবে। কেবল মুসলমান হওয়ার ‘অপরাধে’ তাদের হিসাবের বাইরে রেখে মানবতার কথা বলা যুক্তিসিদ্ধ নয়।
প্রয়োজন ‘হিন্দু-মুসলমানে’র ঐক্য
আরেকটি দিক থেকেও বিষয়টি ভাবতে হবে। বৃহত্তর মুসলমান জনগোষ্ঠী থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা কথিত ‘আদিবাসী’ সম্প্রদায়কে আলাদা করে রাখার বিপজ্জনক দিক এই যে, এতে করে একটি একক জাতীয় সত্তা গড়ে ওঠা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
দেশে একটি ‘হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ’ আছে। সদা সক্রিয়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবেই তার পরিচয়। ইদানীং বিএনপির সমর্থক অনুরূপ আরেকটি সংগঠনও দেখা যাচ্ছে- ‘হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কল্যাণ ঐক্য ফ্রন্ট’। এ দুই সংগঠনের লক্ষ্য কী? এ দেশের হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের আলাদা করে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে কেন? কাদের প্রতিপক্ষে এ ঐক্য? সংখ্যাগুরুর বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুর ঐক্য?
মুুসলমানের বিরুদ্ধে দেশের সব অমুসলিম সম্প্রদায়কে একত্র করার এ প্রয়াসে যারা উৎসাহ যোগাচ্ছেন তাদের মধ্যে দু’ধরনের লোক থাকতে পারেন। প্রথমত, কেউ হয়তো যথার্থই মানবতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অথবা সংখ্যালঘু হিসেবে অবহেলিত কিংবা পিছিয়ে থাকা মানুষের কল্যাণ চিন্তা থেকেই এতে ব্রতী হয়েছেন। পাশাপাশি ভিন্ন কোনো এজেন্ডায় সংখ্যালঘুদের ব্যবহার করার উদ্দেশ্য নিয়েও এ কাজটি হতে পারে। বাংলাদেশের জাতি গঠন প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশের এসব ক্ষুদ্রতর জনগোষ্ঠীকে মূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বৈরী অবস্থানে রাখার দূরভিসন্ধী থাকাও বিচিত্র নয়। আবার দুর্বলের সেবার নামে নিছক বৈষয়িক লাভের জন্য ‘প্রকল্প’ খাড়া করার লোকের অভাবও এ দেশে আছে বলে মনে হয় না।
মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের জনসমষ্টিতে ধর্মীয় বিভাজনে হিন্দু ও মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় তা হাজার বছর ধরেই কমবেশি চলে আসছে।
অবিভক্ত বাংলায় হিন্দু ও মুসলমানের সংখ্যা প্রায় সমান সমান ছিল। মুসলমানরা সংখ্যায় কিছুটা বেশি থাকলেও তাদের অধিকাংশই ছিল গ্রামীণ দরিদ্র কৃষক। ধন-সম্পদ, শিক্ষা এবং প্রভাব-প্রতিপত্তিতে হিন্দুরা ছিল অনেক এগিয়ে। বিশেষ করে আধুনিক বিদ্যাশিক্ষায় মুসলমানরা ছিল অনেক পিছিয়ে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক পর্যন্ত (১৯১২) ‘ব্রিটিশ ভারতের’ রাজধানী ছিল কলকাতা। সেখানে মুসলমানের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। ত্রিশের দশকে এসে কলকাতায় মুসলমানের সংখ্যা দৃষ্টিগোচর হতে থাকে। আর তখনই হিন্দু সমাজপতিরা তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব হওয়ার আশংকায় সংক্ষুব্ধ হতে থাকে। ১৯৩৫-এর ভারত শাসন আইনের অধীনে নির্বাচন হলে বাংলার বিধান সভায় মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিফলিত হতে থাকে। পরপর তিনজন প্রধানমন্ত্রীই হয়েছেন মুসলমান। ফলে হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক-রেষারেষি রাজনৈতিক বিভাজনে রূপান্তরিত হয়। যে বাঙালি হিন্দু ১৯০৫ সালে ‘বঙ্গভঙ্গ’ বাতিল করার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে, আÍঘাতী বোমা হামলায় প্রাণ দিয়েছে, তারাই আবার বাংলা বিভাগের জন্য লড়তে শুরু করেন। ফলে ১৯৪৭ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদে বাংলাকে ভাগ করা, না করার প্রশ্নে যখন ভোটাভুটি হয় তাতে মুসলমান সদস্যরা প্রায় সবাই যুক্ত বাংলার পক্ষে ভোট দেন, আর হিন্দু সদস্যদের প্রায় সবাই সাম্প্র্রদায়িক ভিত্তিতে বাংলাকে ভাগ করার পক্ষে রায় দেন। ফলে মুসলমান সদস্যদের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও হিন্দু সদস্যদের ভোটে বাংলা বিভাগ কার্যকর হয়। মুসলমানদের জন্য পূর্ব বাংলা, আর হিন্দুদের জন্য পশ্চিম বাংলা নির্ধারিত হয়ে গেল। একটি গেল দিল্লির অধীনে, আরেকটি পাকিস্তানে। উপমহাদেশে বাংলার অগ্রবর্তী অবস্থানটি চিরদিনের মতো হারিয়ে গেল।
এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় পূর্ব বাংলার বাঙালি হিন্দুরা। তাদের পিতৃপুরুষের ভিটামাটি ছেড়ে ভিন দেশে পাড়ি জমাতে হয় অবর্ণনীয় অত্যাচার ও দুঃখ-দুর্দশা মাথায় নিয়ে। যে পূর্ব বাংলায় একদা হিন্দুর জনসংখ্যা ছিল ৩০ শতাংশের বেশি, আজকের বাংলাদেশে তা ১০ শতাংশের নিচে।
সেই ‘দেশ বিভাগ’কালীন বৈরিতার জের এখনও থেমে যায়নি। তারই ধারাবাহিকতায় আজকের বাংলাদেশেও ধর্মীয় বিভাজনে মূল দ্বন্দ্ব হিন্দু ও মুসলমানের সেই বৈরিতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাস। বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান সম্প্রদায় এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক নয়। সংখ্যালঘু হওয়ার বিড়ম্বনা থাকলেও তাদের নিয়ে সে রকম কোনো সংকট নেই।
তাই আজকের বাংলাদেশে যদি ধর্মীয় সম্প্রীতির জন্য আন্দোলন করতে হয়, তা হওয়া প্রয়োজন হিন্দু ও মুসলমানের সম্প্রীতির জন্য। প্রয়োজন ‘হিন্দু-মুসলমান ঐক্য’; হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানের ঐক্য নয়। হিন্দু ও মুসলমানের দূরত্ব কমে এলেই এ দেশে এবং সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলজুড়ে মানুষে মানুষে সম্প্রীতির নবদিগন্ত উন্মোচিত হবে।
বাংলাদেশই তা থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে।
শেষ কথা
বাংলাদেশে এখন ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র নামে যা হচ্ছে তাতে কার্যত ‘ইসলাম বিরোধিতা’র প্রবণতাই অধিক পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ আত্মঘাতী প্রবণতারও অবসান হওয়া অত্যাবশ্যক।
যারা ধর্মাচার পালন করেন না, তাদের ‘ধর্মবিরোধী’ হওয়ার প্রয়োজন নেই। ভালো হিন্দু, ভালো মুসলমান, ভালো বৌদ্ধ কিংবা ভালো খ্রিস্টান- পরস্পরকে দূরে সরিয়ে নয়, পরস্পরকে গ্রহণ করার মধ্য দিয়েই কেবল যথার্থ ‘অসাম্প্রদায়িকতা’র চর্চা করতে পারেন।
‘ধর্মান্ধতা’ ও ‘ধর্মবিদ্বেষ’ কোনোটাই আধুনিকতা বা প্রগতিশীলতার ধারক হতে পারে না।
ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী : রাজনীতিক, ভূ-রাজনীতি ও উন্নয়ন গবেষক
shapshin@gtlbd.com
- See more at: http://www.jugantor.com/sub-editorial/2014/01/16/59206#sthash.wXnGEM7t.dpuf
‘প্রগতিশীল’ বলতে আমরা কী বুঝব? ‘ইসলাম বিরোধিতা’ই কি প্রগতিশীলতা? ইসলাম ধর্ম এবং মহানবীকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা এবং মুসলমান পরিচয় যথাসম্ভব লুকিয়ে রাখাই কি আধুনিক ও প্রগতিশীল মননের পরিচায়ক?
‘ধর্মান্ধতা’ যেমন সমাজকে কুসংস্কার, অদৃষ্টবাদ ও অতীতচারিতায় আবদ্ধ করে স্থবির করে রাখে, তেমনি ‘অতি-প্রগতিশীল’ হতে গিয়ে ‘ধর্মবিদ্বেষী’ হয়ে ওঠাও কল্যাণ বয়ে আনে না। আমাদের জাতি গঠনের পথে তা বিরাট অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। অবশ্য কেউ যদি মনে করেন ‘জাতি’ থাকবে কেন, আমরা তো ‘আন্তর্জাতিকতা’য় বিশ্বাসী; অথবা মনে করেন, সারা দুনিয়ার সব জাতি বা রাষ্ট্রের সীমানা তুলে দিয়ে একক বিশ্বমানবতার বিজয় কেতন ওড়ানোর জন্যই আমাদের সংগ্রাম; তাহলে বলার কিছু থাকে না। কিন্তু যদি আমরা বর্তমানকালের ‘জাতি-রাষ্ট্র’ভিত্তিক বিশ্ব সমাজকে নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই, তাহলে অংকটা ভিন্নতর হতে হবে।
একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, ‘বিশ্বায়নে’র উচ্চকিত স্লোগান সত্ত্বেও আজকের দিনে বিভিন্ন জাতি-রাষ্ট্রের সীমান্ত প্রহরা ক্রমেই নিশ্ছিদ্র হয়ে উঠছে। জাতি-রাষ্ট্রের বিভাজন ও সীমান্ত রেখার এ নিশ্ছিদ্রকরণ বিশ্বমানবতার দৃষ্টিকোণ থেকে নেতিবাচক মনে হতে পারে, তবে ভূপৃষ্ঠের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণ, সামাজিক শৃংখলা প্রবর্তন এবং ব্যক্তির জাগতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনে ‘জাতি-রাষ্ট্র’গুলোকে যথাসম্ভব স্বনির্ভর ও সক্ষম করে তোলার বিকল্প নেই। ভূমি ও জনশক্তির ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকেও তা অপরিহার্য। এ অপরিহার্যতা আরও বেড়ে যায় যখন সীমিত সম্পদের সুষম বণ্টন এবং শক্তিমান জনগোষ্ঠী কর্তৃক দুর্বলতর জনগোষ্ঠীর সম্পদ লুণ্ঠনের অব্যাহত প্রক্রিয়া প্রতিহত করার বিষয়টি সামনে চলে আসে।
গত দুই দশকের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, কথিত ‘বিশ্বায়ন’ এবং তা থেকে উৎসারিত ‘মুক্তবাজার’ সবার জন্য পথচলা সমভাবে উন্মুক্ত করে না। এই ‘মুক্ত’ বাজারে মুষ্টিমেয় শক্তিমানের বিশ্বময় দাপিয়ে বেড়ানোর সুযোগ অবারিত হয়েছে বটে, কিন্তু তার বিপরীতে দুর্বলতর মানুষকে শক্তিমানের মাটিতে অন্তর্বাস খুলে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে (অতি সম্প্রতি এক ভারতীয় কূটনীতিকের দূরবস্থার বিষয়টি স্মর্তব্য)। এ অসম আদান-প্রদানকে ‘বিশ্বায়ন’ বলা পরিহাস ছাড়া আর কিছুই নয়। বাণিজ্য-উদ্বৃত্তের একমুখী প্রবাহকে ‘মুক্তবাজার’ আখ্যা দেয়াও সঠিক শব্দচয়ন নয়।
এ ‘বিশ্বায়ন’ ও ‘মুক্তবাজারে’র শেষ গন্তব্য পশ্চিমের কয়েকটি ধনকুবের দেশ। যাদের ধনের উৎস অতীতের সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক শাসন। তারই নতুন সংস্করণ এই ‘বিশ্বায়ন’ ও ‘মুক্তবাজার’। যার সুরক্ষায় উদ্ভাবিত হয়েছে একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতির নয়া মূলমন্ত্র- ‘সভ্যতার সংঘাত’ (Clash of civilization)-এর সভ্যতাবিনাশী তত্ত্ব। মার্কিন নব্য-রক্ষণশীলতার (Neo-con) এ প্রেসক্রিপশন মেনে নিয়েই নির্ধারিত হয়েছে পশ্চিমা শক্তির নয়া রণকৌশল।
Clash of civilization তত্ত্বের উদ্গাতা হান্টিংটন একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বকে দেখেছেন ‘পশ্চিমা সভ্যতা’র বিপরীতে ‘ইসলামী সভ্যতা’র নিরবচ্ছিন্ন লড়াই হিসেবে। এ লড়াইয়ে তিনি চীনকে দেখেছেন সরাসরি ইসলামী সভ্যতার মিত্র হিসেবে। আর রাশিয়া (অর্থডক্স ক্রিশ্চিয়ানিটি) এবং ভারতকে রেখেছেন দুয়ের বাইরে ধূসর অবস্থানে। ১৯৯০ সালের দিকে প্রথম প্রচারিত এ তত্ত্বেরই আক্ষরিক প্রয়োগ দেখা গেছে বিগত দুই দশকে পশ্চিমা কূটনীতি ও রণনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে। যার প্রয়োগ শুরু হয়েছে ইরাককে দিয়ে। অতঃপর আফগানিস্তান, লিবিয়া, মিসর, সিরিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়া, পাকিস্তান- একে একে গোটা মুসলিম বিশ্ব। এক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বা ইউরোপের দেশগুলোতে কোন দল বা কোন ক্ষমতাধর নেতা ক্ষমতায় থাকছেন তাতে হেরফের ঘটছে না।
আমাদের রাজনীতিতেও কি এর প্রভাব পড়ছে?
ইসলামের বিরুদ্ধে পশ্চিমের এ ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ প্রধানত মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকাকে লক্ষ্য করে শুরু হলেও দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াও তার বাইরে আছে বলে মনে হয় না। সম্ভবত পশ্চিমকে সতর্ক করে দিতেই হান্টিংটন চীনকে ইসলামী সভ্যতার মিত্র এবং ভারতকে ‘গ্রে এরিয়া’ হিসেবে অনিশ্চিত অবস্থানে রেখেছেন। তাই পশ্চিমের তীক্ষè দৃষ্টি এখন এ দুটি দেশের দিকে। এ দুই দেশের সঙ্গে পশ্চিমের সম্পর্কের টানাপোড়েনে তার প্রতিফলন স্পষ্ট। এ দুই উদীয়মান পরাশক্তিকে ইসলাম ও মুসলমান থেকে দূরে সরিয়ে রাখা এখন যেন পশ্চিমের রণকৌশলের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে আছে। যার প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতেও পড়ছে বলে মনে হয়।
বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কোনো অর্থেই ইসলামবিরোধী দল নয়। অতীতে মার্ক্সবাদী রাজনীতি করেছেন এমন বেশ কিছু রাজনীতিক ও তাদের অনুসারীরা এ দলে যোগ দিয়েছেন। ধর্ম বিষয়ে তাদের কিছুটা উদাসীন থাকা অস্বাভাবিক নয়। তবে মূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা ব্যক্তি জীবনে তাদের ধর্মীয় পরিচয় দৃঢ়তার সঙ্গেই ধারণ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই তার দৃষ্টান্ত। রাজনীতিতে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র কথা জোরেশোরে বললেও।
কিন্তু আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বলয়ে অবস্থানকারী কিছু কিছু গোষ্ঠীর ‘ইসলাম বিদ্বেষ’ মোটেই অস্পষ্ট নয়। কেবল তা-ই নয়, এ দেশের ধর্মীয় ও নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোকে নিয়ে তাদের নানাবিধ রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মসূচি ও বক্তব্য অনেক ক্ষেত্রে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আহত করে। যার মাশুল দিতে হয় আওয়ামী লীগকেই।
মৌলবাদী ধর্মাচার যারা পালন করেন না, এমনকি যারা ধর্মহীন জীবন দর্শনের অনুসারী, তাদের দিক থেকেও মুসলমান বা ইসলামের সঙ্গে অযথা সাংঘর্ষিক অবস্থান তৈরি করা রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী। এর ফলে এ ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে কেবল যে সংশ্লিষ্ট দল-উপদল সম্পর্কে জনমনে বিরূপ মনোভাব গড়ে ওঠে তা-ই নয়, এ অপরিণামদর্শিতা দেশে কট্টর মৌলবাদের ভিত প্রসারিত করে। যা পরিণামে তথাকথিত ধর্মীয় ‘জঙ্গিবাদ’ বা ‘সন্ত্রাসবাদ’কে উস্কে দিয়ে হিতে বিপরীত ঘটাতে পারে।
বাংলাদেশে এখন সেই পরিস্থিতিই বিরাজ করছে।
‘ধর্মান্ধতা’ বনাম ‘ধর্মবিদ্বেষ’
এখন বাংলাদেশে একদিকে কট্টর ‘ধর্মান্ধতা’ এবং অপরদিকে চরম ‘ধর্মবিদ্বেষ’ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। এ ধর্মবিদ্বেষ কার্যক্ষেত্রে আবার শুধু ‘ইসলাম বিদ্বেষ’ (অন্য কোনো ধর্ম নয়)। আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছু দল-উপদল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের পাশ কাটিয়ে ‘সংখ্যালঘু রাজনীতি’র চর্চায় অনেক সময় ও শ্রম বিনিয়োগ করে থাকে। সংখ্যালঘুদের প্রতি সংবেদনশীল থাকা এবং তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার সংরক্ষণে সচেতন থাকা অবশ্যই উন্নত মনমানসিকতার পরিচায়ক। তবে জাতীয় রাজনীতিতে কোনো অর্থবহ অবদান রাখতে হলে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর চিন্তা-ভাবনা, পছন্দ-অপছন্দকে মূল্য দেয়া জরুরি। তাছাড়া কেউ যদি হতদরিদ্র মানুষের জন্য কাজ করতে চান, তাহলেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর হতদরিদ্র মানুষের কথা ভুলে থাকলে চলবে কেন? সারা দেশের কথা থাক, শুধু এ ঢাকা শহরে যতজন মানুষ ফুটপাতে বা বস্তিতে অবাসযোগ্য পরিবেশে অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবনযাপন করে, তাদের সংখ্যা সম্ভবত সারা দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সব মানুষের সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে। হতদরিদ্র মানুষ হিসেবে তাদেরও হিসাবে নিতে হবে। কেবল মুসলমান হওয়ার ‘অপরাধে’ তাদের হিসাবের বাইরে রেখে মানবতার কথা বলা যুক্তিসিদ্ধ নয়।
প্রয়োজন ‘হিন্দু-মুসলমানে’র ঐক্য
আরেকটি দিক থেকেও বিষয়টি ভাবতে হবে। বৃহত্তর মুসলমান জনগোষ্ঠী থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা কথিত ‘আদিবাসী’ সম্প্রদায়কে আলাদা করে রাখার বিপজ্জনক দিক এই যে, এতে করে একটি একক জাতীয় সত্তা গড়ে ওঠা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
দেশে একটি ‘হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ’ আছে। সদা সক্রিয়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবেই তার পরিচয়। ইদানীং বিএনপির সমর্থক অনুরূপ আরেকটি সংগঠনও দেখা যাচ্ছে- ‘হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কল্যাণ ঐক্য ফ্রন্ট’। এ দুই সংগঠনের লক্ষ্য কী? এ দেশের হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের আলাদা করে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে কেন? কাদের প্রতিপক্ষে এ ঐক্য? সংখ্যাগুরুর বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুর ঐক্য?
মুুসলমানের বিরুদ্ধে দেশের সব অমুসলিম সম্প্রদায়কে একত্র করার এ প্রয়াসে যারা উৎসাহ যোগাচ্ছেন তাদের মধ্যে দু’ধরনের লোক থাকতে পারেন। প্রথমত, কেউ হয়তো যথার্থই মানবতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অথবা সংখ্যালঘু হিসেবে অবহেলিত কিংবা পিছিয়ে থাকা মানুষের কল্যাণ চিন্তা থেকেই এতে ব্রতী হয়েছেন। পাশাপাশি ভিন্ন কোনো এজেন্ডায় সংখ্যালঘুদের ব্যবহার করার উদ্দেশ্য নিয়েও এ কাজটি হতে পারে। বাংলাদেশের জাতি গঠন প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশের এসব ক্ষুদ্রতর জনগোষ্ঠীকে মূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বৈরী অবস্থানে রাখার দূরভিসন্ধী থাকাও বিচিত্র নয়। আবার দুর্বলের সেবার নামে নিছক বৈষয়িক লাভের জন্য ‘প্রকল্প’ খাড়া করার লোকের অভাবও এ দেশে আছে বলে মনে হয় না।
মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের জনসমষ্টিতে ধর্মীয় বিভাজনে হিন্দু ও মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় তা হাজার বছর ধরেই কমবেশি চলে আসছে।
অবিভক্ত বাংলায় হিন্দু ও মুসলমানের সংখ্যা প্রায় সমান সমান ছিল। মুসলমানরা সংখ্যায় কিছুটা বেশি থাকলেও তাদের অধিকাংশই ছিল গ্রামীণ দরিদ্র কৃষক। ধন-সম্পদ, শিক্ষা এবং প্রভাব-প্রতিপত্তিতে হিন্দুরা ছিল অনেক এগিয়ে। বিশেষ করে আধুনিক বিদ্যাশিক্ষায় মুসলমানরা ছিল অনেক পিছিয়ে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক পর্যন্ত (১৯১২) ‘ব্রিটিশ ভারতের’ রাজধানী ছিল কলকাতা। সেখানে মুসলমানের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। ত্রিশের দশকে এসে কলকাতায় মুসলমানের সংখ্যা দৃষ্টিগোচর হতে থাকে। আর তখনই হিন্দু সমাজপতিরা তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব হওয়ার আশংকায় সংক্ষুব্ধ হতে থাকে। ১৯৩৫-এর ভারত শাসন আইনের অধীনে নির্বাচন হলে বাংলার বিধান সভায় মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিফলিত হতে থাকে। পরপর তিনজন প্রধানমন্ত্রীই হয়েছেন মুসলমান। ফলে হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক-রেষারেষি রাজনৈতিক বিভাজনে রূপান্তরিত হয়। যে বাঙালি হিন্দু ১৯০৫ সালে ‘বঙ্গভঙ্গ’ বাতিল করার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে, আÍঘাতী বোমা হামলায় প্রাণ দিয়েছে, তারাই আবার বাংলা বিভাগের জন্য লড়তে শুরু করেন। ফলে ১৯৪৭ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদে বাংলাকে ভাগ করা, না করার প্রশ্নে যখন ভোটাভুটি হয় তাতে মুসলমান সদস্যরা প্রায় সবাই যুক্ত বাংলার পক্ষে ভোট দেন, আর হিন্দু সদস্যদের প্রায় সবাই সাম্প্র্রদায়িক ভিত্তিতে বাংলাকে ভাগ করার পক্ষে রায় দেন। ফলে মুসলমান সদস্যদের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও হিন্দু সদস্যদের ভোটে বাংলা বিভাগ কার্যকর হয়। মুসলমানদের জন্য পূর্ব বাংলা, আর হিন্দুদের জন্য পশ্চিম বাংলা নির্ধারিত হয়ে গেল। একটি গেল দিল্লির অধীনে, আরেকটি পাকিস্তানে। উপমহাদেশে বাংলার অগ্রবর্তী অবস্থানটি চিরদিনের মতো হারিয়ে গেল।
এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় পূর্ব বাংলার বাঙালি হিন্দুরা। তাদের পিতৃপুরুষের ভিটামাটি ছেড়ে ভিন দেশে পাড়ি জমাতে হয় অবর্ণনীয় অত্যাচার ও দুঃখ-দুর্দশা মাথায় নিয়ে। যে পূর্ব বাংলায় একদা হিন্দুর জনসংখ্যা ছিল ৩০ শতাংশের বেশি, আজকের বাংলাদেশে তা ১০ শতাংশের নিচে।
সেই ‘দেশ বিভাগ’কালীন বৈরিতার জের এখনও থেমে যায়নি। তারই ধারাবাহিকতায় আজকের বাংলাদেশেও ধর্মীয় বিভাজনে মূল দ্বন্দ্ব হিন্দু ও মুসলমানের সেই বৈরিতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাস। বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান সম্প্রদায় এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক নয়। সংখ্যালঘু হওয়ার বিড়ম্বনা থাকলেও তাদের নিয়ে সে রকম কোনো সংকট নেই।
তাই আজকের বাংলাদেশে যদি ধর্মীয় সম্প্রীতির জন্য আন্দোলন করতে হয়, তা হওয়া প্রয়োজন হিন্দু ও মুসলমানের সম্প্রীতির জন্য। প্রয়োজন ‘হিন্দু-মুসলমান ঐক্য’; হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানের ঐক্য নয়। হিন্দু ও মুসলমানের দূরত্ব কমে এলেই এ দেশে এবং সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলজুড়ে মানুষে মানুষে সম্প্রীতির নবদিগন্ত উন্মোচিত হবে।
বাংলাদেশই তা থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে।
শেষ কথা
বাংলাদেশে এখন ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র নামে যা হচ্ছে তাতে কার্যত ‘ইসলাম বিরোধিতা’র প্রবণতাই অধিক পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ আত্মঘাতী প্রবণতারও অবসান হওয়া অত্যাবশ্যক।
যারা ধর্মাচার পালন করেন না, তাদের ‘ধর্মবিরোধী’ হওয়ার প্রয়োজন নেই। ভালো হিন্দু, ভালো মুসলমান, ভালো বৌদ্ধ কিংবা ভালো খ্রিস্টান- পরস্পরকে দূরে সরিয়ে নয়, পরস্পরকে গ্রহণ করার মধ্য দিয়েই কেবল যথার্থ ‘অসাম্প্রদায়িকতা’র চর্চা করতে পারেন।
‘ধর্মান্ধতা’ ও ‘ধর্মবিদ্বেষ’ কোনোটাই আধুনিকতা বা প্রগতিশীলতার ধারক হতে পারে না।
ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী : রাজনীতিক, ভূ-রাজনীতি ও উন্নয়ন গবেষক
shapshin@gtlbd.com
- See more at: http://www.jugantor.com/sub-editorial/2014/01/16/59206#sthash.wXnGEM7t.dpuf
‘প্রগতিশীল’ বলতে আমরা কী বুঝব? ‘ইসলাম বিরোধিতা’ই কি প্রগতিশীলতা? ইসলাম ধর্ম এবং মহানবীকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা এবং মুসলমান পরিচয় যথাসম্ভব লুকিয়ে রাখাই কি আধুনিক ও প্রগতিশীল মননের পরিচায়ক?
‘ধর্মান্ধতা’ যেমন সমাজকে কুসংস্কার, অদৃষ্টবাদ ও অতীতচারিতায় আবদ্ধ করে স্থবির করে রাখে, তেমনি ‘অতি-প্রগতিশীল’ হতে গিয়ে ‘ধর্মবিদ্বেষী’ হয়ে ওঠাও কল্যাণ বয়ে আনে না। আমাদের জাতি গঠনের পথে তা বিরাট অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। অবশ্য কেউ যদি মনে করেন ‘জাতি’ থাকবে কেন, আমরা তো ‘আন্তর্জাতিকতা’য় বিশ্বাসী; অথবা মনে করেন, সারা দুনিয়ার সব জাতি বা রাষ্ট্রের সীমানা তুলে দিয়ে একক বিশ্বমানবতার বিজয় কেতন ওড়ানোর জন্যই আমাদের সংগ্রাম; তাহলে বলার কিছু থাকে না। কিন্তু যদি আমরা বর্তমানকালের ‘জাতি-রাষ্ট্র’ভিত্তিক বিশ্ব সমাজকে নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই, তাহলে অংকটা ভিন্নতর হতে হবে।
একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, ‘বিশ্বায়নে’র উচ্চকিত স্লোগান সত্ত্বেও আজকের দিনে বিভিন্ন জাতি-রাষ্ট্রের সীমান্ত প্রহরা ক্রমেই নিশ্ছিদ্র হয়ে উঠছে। জাতি-রাষ্ট্রের বিভাজন ও সীমান্ত রেখার এ নিশ্ছিদ্রকরণ বিশ্বমানবতার দৃষ্টিকোণ থেকে নেতিবাচক মনে হতে পারে, তবে ভূপৃষ্ঠের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণ, সামাজিক শৃংখলা প্রবর্তন এবং ব্যক্তির জাগতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনে ‘জাতি-রাষ্ট্র’গুলোকে যথাসম্ভব স্বনির্ভর ও সক্ষম করে তোলার বিকল্প নেই। ভূমি ও জনশক্তির ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকেও তা অপরিহার্য। এ অপরিহার্যতা আরও বেড়ে যায় যখন সীমিত সম্পদের সুষম বণ্টন এবং শক্তিমান জনগোষ্ঠী কর্তৃক দুর্বলতর জনগোষ্ঠীর সম্পদ লুণ্ঠনের অব্যাহত প্রক্রিয়া প্রতিহত করার বিষয়টি সামনে চলে আসে।
গত দুই দশকের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, কথিত ‘বিশ্বায়ন’ এবং তা থেকে উৎসারিত ‘মুক্তবাজার’ সবার জন্য পথচলা সমভাবে উন্মুক্ত করে না। এই ‘মুক্ত’ বাজারে মুষ্টিমেয় শক্তিমানের বিশ্বময় দাপিয়ে বেড়ানোর সুযোগ অবারিত হয়েছে বটে, কিন্তু তার বিপরীতে দুর্বলতর মানুষকে শক্তিমানের মাটিতে অন্তর্বাস খুলে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে (অতি সম্প্রতি এক ভারতীয় কূটনীতিকের দূরবস্থার বিষয়টি স্মর্তব্য)। এ অসম আদান-প্রদানকে ‘বিশ্বায়ন’ বলা পরিহাস ছাড়া আর কিছুই নয়। বাণিজ্য-উদ্বৃত্তের একমুখী প্রবাহকে ‘মুক্তবাজার’ আখ্যা দেয়াও সঠিক শব্দচয়ন নয়।
এ ‘বিশ্বায়ন’ ও ‘মুক্তবাজারে’র শেষ গন্তব্য পশ্চিমের কয়েকটি ধনকুবের দেশ। যাদের ধনের উৎস অতীতের সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক শাসন। তারই নতুন সংস্করণ এই ‘বিশ্বায়ন’ ও ‘মুক্তবাজার’। যার সুরক্ষায় উদ্ভাবিত হয়েছে একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতির নয়া মূলমন্ত্র- ‘সভ্যতার সংঘাত’ (Clash of civilization)-এর সভ্যতাবিনাশী তত্ত্ব। মার্কিন নব্য-রক্ষণশীলতার (Neo-con) এ প্রেসক্রিপশন মেনে নিয়েই নির্ধারিত হয়েছে পশ্চিমা শক্তির নয়া রণকৌশল।
Clash of civilization তত্ত্বের উদ্গাতা হান্টিংটন একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বকে দেখেছেন ‘পশ্চিমা সভ্যতা’র বিপরীতে ‘ইসলামী সভ্যতা’র নিরবচ্ছিন্ন লড়াই হিসেবে। এ লড়াইয়ে তিনি চীনকে দেখেছেন সরাসরি ইসলামী সভ্যতার মিত্র হিসেবে। আর রাশিয়া (অর্থডক্স ক্রিশ্চিয়ানিটি) এবং ভারতকে রেখেছেন দুয়ের বাইরে ধূসর অবস্থানে। ১৯৯০ সালের দিকে প্রথম প্রচারিত এ তত্ত্বেরই আক্ষরিক প্রয়োগ দেখা গেছে বিগত দুই দশকে পশ্চিমা কূটনীতি ও রণনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে। যার প্রয়োগ শুরু হয়েছে ইরাককে দিয়ে। অতঃপর আফগানিস্তান, লিবিয়া, মিসর, সিরিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়া, পাকিস্তান- একে একে গোটা মুসলিম বিশ্ব। এক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বা ইউরোপের দেশগুলোতে কোন দল বা কোন ক্ষমতাধর নেতা ক্ষমতায় থাকছেন তাতে হেরফের ঘটছে না।
আমাদের রাজনীতিতেও কি এর প্রভাব পড়ছে?
ইসলামের বিরুদ্ধে পশ্চিমের এ ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ প্রধানত মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকাকে লক্ষ্য করে শুরু হলেও দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াও তার বাইরে আছে বলে মনে হয় না। সম্ভবত পশ্চিমকে সতর্ক করে দিতেই হান্টিংটন চীনকে ইসলামী সভ্যতার মিত্র এবং ভারতকে ‘গ্রে এরিয়া’ হিসেবে অনিশ্চিত অবস্থানে রেখেছেন। তাই পশ্চিমের তীক্ষè দৃষ্টি এখন এ দুটি দেশের দিকে। এ দুই দেশের সঙ্গে পশ্চিমের সম্পর্কের টানাপোড়েনে তার প্রতিফলন স্পষ্ট। এ দুই উদীয়মান পরাশক্তিকে ইসলাম ও মুসলমান থেকে দূরে সরিয়ে রাখা এখন যেন পশ্চিমের রণকৌশলের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে আছে। যার প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতেও পড়ছে বলে মনে হয়।
বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কোনো অর্থেই ইসলামবিরোধী দল নয়। অতীতে মার্ক্সবাদী রাজনীতি করেছেন এমন বেশ কিছু রাজনীতিক ও তাদের অনুসারীরা এ দলে যোগ দিয়েছেন। ধর্ম বিষয়ে তাদের কিছুটা উদাসীন থাকা অস্বাভাবিক নয়। তবে মূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা ব্যক্তি জীবনে তাদের ধর্মীয় পরিচয় দৃঢ়তার সঙ্গেই ধারণ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই তার দৃষ্টান্ত। রাজনীতিতে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র কথা জোরেশোরে বললেও।
কিন্তু আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বলয়ে অবস্থানকারী কিছু কিছু গোষ্ঠীর ‘ইসলাম বিদ্বেষ’ মোটেই অস্পষ্ট নয়। কেবল তা-ই নয়, এ দেশের ধর্মীয় ও নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোকে নিয়ে তাদের নানাবিধ রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মসূচি ও বক্তব্য অনেক ক্ষেত্রে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আহত করে। যার মাশুল দিতে হয় আওয়ামী লীগকেই।
মৌলবাদী ধর্মাচার যারা পালন করেন না, এমনকি যারা ধর্মহীন জীবন দর্শনের অনুসারী, তাদের দিক থেকেও মুসলমান বা ইসলামের সঙ্গে অযথা সাংঘর্ষিক অবস্থান তৈরি করা রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী। এর ফলে এ ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে কেবল যে সংশ্লিষ্ট দল-উপদল সম্পর্কে জনমনে বিরূপ মনোভাব গড়ে ওঠে তা-ই নয়, এ অপরিণামদর্শিতা দেশে কট্টর মৌলবাদের ভিত প্রসারিত করে। যা পরিণামে তথাকথিত ধর্মীয় ‘জঙ্গিবাদ’ বা ‘সন্ত্রাসবাদ’কে উস্কে দিয়ে হিতে বিপরীত ঘটাতে পারে।
বাংলাদেশে এখন সেই পরিস্থিতিই বিরাজ করছে।
‘ধর্মান্ধতা’ বনাম ‘ধর্মবিদ্বেষ’
এখন বাংলাদেশে একদিকে কট্টর ‘ধর্মান্ধতা’ এবং অপরদিকে চরম ‘ধর্মবিদ্বেষ’ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। এ ধর্মবিদ্বেষ কার্যক্ষেত্রে আবার শুধু ‘ইসলাম বিদ্বেষ’ (অন্য কোনো ধর্ম নয়)। আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছু দল-উপদল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের পাশ কাটিয়ে ‘সংখ্যালঘু রাজনীতি’র চর্চায় অনেক সময় ও শ্রম বিনিয়োগ করে থাকে। সংখ্যালঘুদের প্রতি সংবেদনশীল থাকা এবং তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার সংরক্ষণে সচেতন থাকা অবশ্যই উন্নত মনমানসিকতার পরিচায়ক। তবে জাতীয় রাজনীতিতে কোনো অর্থবহ অবদান রাখতে হলে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর চিন্তা-ভাবনা, পছন্দ-অপছন্দকে মূল্য দেয়া জরুরি। তাছাড়া কেউ যদি হতদরিদ্র মানুষের জন্য কাজ করতে চান, তাহলেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর হতদরিদ্র মানুষের কথা ভুলে থাকলে চলবে কেন? সারা দেশের কথা থাক, শুধু এ ঢাকা শহরে যতজন মানুষ ফুটপাতে বা বস্তিতে অবাসযোগ্য পরিবেশে অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবনযাপন করে, তাদের সংখ্যা সম্ভবত সারা দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সব মানুষের সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে। হতদরিদ্র মানুষ হিসেবে তাদেরও হিসাবে নিতে হবে। কেবল মুসলমান হওয়ার ‘অপরাধে’ তাদের হিসাবের বাইরে রেখে মানবতার কথা বলা যুক্তিসিদ্ধ নয়।
প্রয়োজন ‘হিন্দু-মুসলমানে’র ঐক্য
আরেকটি দিক থেকেও বিষয়টি ভাবতে হবে। বৃহত্তর মুসলমান জনগোষ্ঠী থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা কথিত ‘আদিবাসী’ সম্প্রদায়কে আলাদা করে রাখার বিপজ্জনক দিক এই যে, এতে করে একটি একক জাতীয় সত্তা গড়ে ওঠা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
দেশে একটি ‘হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ’ আছে। সদা সক্রিয়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবেই তার পরিচয়। ইদানীং বিএনপির সমর্থক অনুরূপ আরেকটি সংগঠনও দেখা যাচ্ছে- ‘হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কল্যাণ ঐক্য ফ্রন্ট’। এ দুই সংগঠনের লক্ষ্য কী? এ দেশের হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের আলাদা করে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে কেন? কাদের প্রতিপক্ষে এ ঐক্য? সংখ্যাগুরুর বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুর ঐক্য?
মুুসলমানের বিরুদ্ধে দেশের সব অমুসলিম সম্প্রদায়কে একত্র করার এ প্রয়াসে যারা উৎসাহ যোগাচ্ছেন তাদের মধ্যে দু’ধরনের লোক থাকতে পারেন। প্রথমত, কেউ হয়তো যথার্থই মানবতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অথবা সংখ্যালঘু হিসেবে অবহেলিত কিংবা পিছিয়ে থাকা মানুষের কল্যাণ চিন্তা থেকেই এতে ব্রতী হয়েছেন। পাশাপাশি ভিন্ন কোনো এজেন্ডায় সংখ্যালঘুদের ব্যবহার করার উদ্দেশ্য নিয়েও এ কাজটি হতে পারে। বাংলাদেশের জাতি গঠন প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশের এসব ক্ষুদ্রতর জনগোষ্ঠীকে মূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বৈরী অবস্থানে রাখার দূরভিসন্ধী থাকাও বিচিত্র নয়। আবার দুর্বলের সেবার নামে নিছক বৈষয়িক লাভের জন্য ‘প্রকল্প’ খাড়া করার লোকের অভাবও এ দেশে আছে বলে মনে হয় না।
মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের জনসমষ্টিতে ধর্মীয় বিভাজনে হিন্দু ও মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় তা হাজার বছর ধরেই কমবেশি চলে আসছে।
অবিভক্ত বাংলায় হিন্দু ও মুসলমানের সংখ্যা প্রায় সমান সমান ছিল। মুসলমানরা সংখ্যায় কিছুটা বেশি থাকলেও তাদের অধিকাংশই ছিল গ্রামীণ দরিদ্র কৃষক। ধন-সম্পদ, শিক্ষা এবং প্রভাব-প্রতিপত্তিতে হিন্দুরা ছিল অনেক এগিয়ে। বিশেষ করে আধুনিক বিদ্যাশিক্ষায় মুসলমানরা ছিল অনেক পিছিয়ে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক পর্যন্ত (১৯১২) ‘ব্রিটিশ ভারতের’ রাজধানী ছিল কলকাতা। সেখানে মুসলমানের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। ত্রিশের দশকে এসে কলকাতায় মুসলমানের সংখ্যা দৃষ্টিগোচর হতে থাকে। আর তখনই হিন্দু সমাজপতিরা তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব হওয়ার আশংকায় সংক্ষুব্ধ হতে থাকে। ১৯৩৫-এর ভারত শাসন আইনের অধীনে নির্বাচন হলে বাংলার বিধান সভায় মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিফলিত হতে থাকে। পরপর তিনজন প্রধানমন্ত্রীই হয়েছেন মুসলমান। ফলে হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক-রেষারেষি রাজনৈতিক বিভাজনে রূপান্তরিত হয়। যে বাঙালি হিন্দু ১৯০৫ সালে ‘বঙ্গভঙ্গ’ বাতিল করার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে, আÍঘাতী বোমা হামলায় প্রাণ দিয়েছে, তারাই আবার বাংলা বিভাগের জন্য লড়তে শুরু করেন। ফলে ১৯৪৭ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদে বাংলাকে ভাগ করা, না করার প্রশ্নে যখন ভোটাভুটি হয় তাতে মুসলমান সদস্যরা প্রায় সবাই যুক্ত বাংলার পক্ষে ভোট দেন, আর হিন্দু সদস্যদের প্রায় সবাই সাম্প্র্রদায়িক ভিত্তিতে বাংলাকে ভাগ করার পক্ষে রায় দেন। ফলে মুসলমান সদস্যদের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও হিন্দু সদস্যদের ভোটে বাংলা বিভাগ কার্যকর হয়। মুসলমানদের জন্য পূর্ব বাংলা, আর হিন্দুদের জন্য পশ্চিম বাংলা নির্ধারিত হয়ে গেল। একটি গেল দিল্লির অধীনে, আরেকটি পাকিস্তানে। উপমহাদেশে বাংলার অগ্রবর্তী অবস্থানটি চিরদিনের মতো হারিয়ে গেল।
এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় পূর্ব বাংলার বাঙালি হিন্দুরা। তাদের পিতৃপুরুষের ভিটামাটি ছেড়ে ভিন দেশে পাড়ি জমাতে হয় অবর্ণনীয় অত্যাচার ও দুঃখ-দুর্দশা মাথায় নিয়ে। যে পূর্ব বাংলায় একদা হিন্দুর জনসংখ্যা ছিল ৩০ শতাংশের বেশি, আজকের বাংলাদেশে তা ১০ শতাংশের নিচে।
সেই ‘দেশ বিভাগ’কালীন বৈরিতার জের এখনও থেমে যায়নি। তারই ধারাবাহিকতায় আজকের বাংলাদেশেও ধর্মীয় বিভাজনে মূল দ্বন্দ্ব হিন্দু ও মুসলমানের সেই বৈরিতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাস। বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান সম্প্রদায় এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক নয়। সংখ্যালঘু হওয়ার বিড়ম্বনা থাকলেও তাদের নিয়ে সে রকম কোনো সংকট নেই।
তাই আজকের বাংলাদেশে যদি ধর্মীয় সম্প্রীতির জন্য আন্দোলন করতে হয়, তা হওয়া প্রয়োজন হিন্দু ও মুসলমানের সম্প্রীতির জন্য। প্রয়োজন ‘হিন্দু-মুসলমান ঐক্য’; হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানের ঐক্য নয়। হিন্দু ও মুসলমানের দূরত্ব কমে এলেই এ দেশে এবং সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলজুড়ে মানুষে মানুষে সম্প্রীতির নবদিগন্ত উন্মোচিত হবে।
বাংলাদেশই তা থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে।
শেষ কথা
বাংলাদেশে এখন ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র নামে যা হচ্ছে তাতে কার্যত ‘ইসলাম বিরোধিতা’র প্রবণতাই অধিক পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ আত্মঘাতী প্রবণতারও অবসান হওয়া অত্যাবশ্যক।
যারা ধর্মাচার পালন করেন না, তাদের ‘ধর্মবিরোধী’ হওয়ার প্রয়োজন নেই। ভালো হিন্দু, ভালো মুসলমান, ভালো বৌদ্ধ কিংবা ভালো খ্রিস্টান- পরস্পরকে দূরে সরিয়ে নয়, পরস্পরকে গ্রহণ করার মধ্য দিয়েই কেবল যথার্থ ‘অসাম্প্রদায়িকতা’র চর্চা করতে পারেন।
‘ধর্মান্ধতা’ ও ‘ধর্মবিদ্বেষ’ কোনোটাই আধুনিকতা বা প্রগতিশীলতার ধারক হতে পারে না।
ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী : রাজনীতিক, ভূ-রাজনীতি ও উন্নয়ন গবেষক
shapshin@gtlbd.com
- See more at: http://www.jugantor.com/sub-editorial/2014/01/16/59206#sthash.wXnGEM7t.dpuf
বিষয় সমূহঃ >আল কোরআন/আরবী থেকে-বাংলা-ইংরেজী সহ<+>ইসলাম< +>আদর্শ নারী Adarsha Nari <+>নারী পুরুষের যৌন সমস্যা সমাধান<+>নারীস্বাস্থ্য সমস্যা ও পরামর্শ<+>মাসিক মনোজগত<+>যৌন শিক্ষা/যৌন মিলন/জন্মনিয়ন্ত্রন<+>ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর কর্তব্য ও মধুর মিলন।<+>কামসূত্র (সংক্ষিপ্ত)<+>দাম্পত্য জীবন/বিবাহ<+>কারবালার করুণ ইতিহাস<+>ডাঃজাকির নায়েকের লেকচার।<+>কম্পিউটার/মোবাইল/ইন্টারনেট<+>সর্বাধিক পঠিত<+>সোনা মনিদের মজার মজার গল্পের ভাণ্ডার(আন লিমিটেড)<+>হাসির দুনিয়া -কৌতুক এবং জোকস(আন লিমিটেড)<+>এই পোস্ট গুলি কি আপনি পড়েছেন?<+>আমাদের রাজনিতি/মিডিয়া <
আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুণ।
এই ব্লগে পড়তে কি সমস্যা হয়?আপনার কি টাকা বেশি খরচ হয়ে যায়?
ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী
সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি, ২০১৪
‘প্রগতিশীল’ বলতে আমরা কী বুঝব? ‘ইসলাম বিরোধিতা’ই কি প্রগতিশীলতা? ইসলাম ধর্ম এবং মহানবীকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা এবং মুসলমান পরিচয় যথাসম্ভব লুকিয়ে রাখাই কি আধুনিক ও প্রগতিশীল মননের পরিচায়ক?
‘ধর্মান্ধতা’ যেমন সমাজকে কুসংস্কার, অদৃষ্টবাদ ও অতীতচারিতায় আবদ্ধ করে স্থবির করে রাখে, তেমনি ‘অতি-প্রগতিশীল’ হতে গিয়ে ‘ধর্মবিদ্বেষী’ হয়ে ওঠাও কল্যাণ বয়ে আনে না। আমাদের জাতি গঠনের পথে তা বিরাট অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। অবশ্য কেউ যদি মনে করেন ‘জাতি’ থাকবে কেন, আমরা তো ‘আন্তর্জাতিকতা’য় বিশ্বাসী; অথবা মনে করেন, সারা দুনিয়ার সব জাতি বা রাষ্ট্রের সীমানা তুলে দিয়ে একক বিশ্বমানবতার বিজয় কেতন ওড়ানোর জন্যই আমাদের সংগ্রাম; তাহলে বলার কিছু থাকে না। কিন্তু যদি আমরা বর্তমানকালের ‘জাতি-রাষ্ট্র’ভিত্তিক বিশ্ব সমাজকে নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই, তাহলে অংকটা ভিন্নতর হতে হবে।
একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, ‘বিশ্বায়নে’র উচ্চকিত স্লোগান সত্ত্বেও আজকের দিনে বিভিন্ন জাতি-রাষ্ট্রের সীমান্ত প্রহরা ক্রমেই নিশ্ছিদ্র হয়ে উঠছে। জাতি-রাষ্ট্রের বিভাজন ও সীমান্ত রেখার এ নিশ্ছিদ্রকরণ বিশ্বমানবতার দৃষ্টিকোণ থেকে নেতিবাচক মনে হতে পারে, তবে ভূপৃষ্ঠের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণ, সামাজিক শৃংখলা প্রবর্তন এবং ব্যক্তির জাগতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনে ‘জাতি-রাষ্ট্র’গুলোকে যথাসম্ভব স্বনির্ভর ও সক্ষম করে তোলার বিকল্প নেই। ভূমি ও জনশক্তির ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকেও তা অপরিহার্য। এ অপরিহার্যতা আরও বেড়ে যায় যখন সীমিত সম্পদের সুষম বণ্টন এবং শক্তিমান জনগোষ্ঠী কর্তৃক দুর্বলতর জনগোষ্ঠীর সম্পদ লুণ্ঠনের অব্যাহত প্রক্রিয়া প্রতিহত করার বিষয়টি সামনে চলে আসে।
গত দুই দশকের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, কথিত ‘বিশ্বায়ন’ এবং তা থেকে উৎসারিত ‘মুক্তবাজার’ সবার জন্য পথচলা সমভাবে উন্মুক্ত করে না। এই ‘মুক্ত’ বাজারে মুষ্টিমেয় শক্তিমানের বিশ্বময় দাপিয়ে বেড়ানোর সুযোগ অবারিত হয়েছে বটে, কিন্তু তার বিপরীতে দুর্বলতর মানুষকে শক্তিমানের মাটিতে অন্তর্বাস খুলে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে (অতি সম্প্রতি এক ভারতীয় কূটনীতিকের দূরবস্থার বিষয়টি স্মর্তব্য)। এ অসম আদান-প্রদানকে ‘বিশ্বায়ন’ বলা পরিহাস ছাড়া আর কিছুই নয়। বাণিজ্য-উদ্বৃত্তের একমুখী প্রবাহকে ‘মুক্তবাজার’ আখ্যা দেয়াও সঠিক শব্দচয়ন নয়।
এ ‘বিশ্বায়ন’ ও ‘মুক্তবাজারে’র শেষ গন্তব্য পশ্চিমের কয়েকটি ধনকুবের দেশ। যাদের ধনের উৎস অতীতের সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক শাসন। তারই নতুন সংস্করণ এই ‘বিশ্বায়ন’ ও ‘মুক্তবাজার’। যার সুরক্ষায় উদ্ভাবিত হয়েছে একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতির নয়া মূলমন্ত্র- ‘সভ্যতার সংঘাত’ (Clash of civilization)-এর সভ্যতাবিনাশী তত্ত্ব। মার্কিন নব্য-রক্ষণশীলতার (Neo-con) এ প্রেসক্রিপশন মেনে নিয়েই নির্ধারিত হয়েছে পশ্চিমা শক্তির নয়া রণকৌশল।
Clash of civilization তত্ত্বের উদ্গাতা হান্টিংটন একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বকে দেখেছেন ‘পশ্চিমা সভ্যতা’র বিপরীতে ‘ইসলামী সভ্যতা’র নিরবচ্ছিন্ন লড়াই হিসেবে। এ লড়াইয়ে তিনি চীনকে দেখেছেন সরাসরি ইসলামী সভ্যতার মিত্র হিসেবে। আর রাশিয়া (অর্থডক্স ক্রিশ্চিয়ানিটি) এবং ভারতকে রেখেছেন দুয়ের বাইরে ধূসর অবস্থানে। ১৯৯০ সালের দিকে প্রথম প্রচারিত এ তত্ত্বেরই আক্ষরিক প্রয়োগ দেখা গেছে বিগত দুই দশকে পশ্চিমা কূটনীতি ও রণনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে। যার প্রয়োগ শুরু হয়েছে ইরাককে দিয়ে। অতঃপর আফগানিস্তান, লিবিয়া, মিসর, সিরিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়া, পাকিস্তান- একে একে গোটা মুসলিম বিশ্ব। এক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বা ইউরোপের দেশগুলোতে কোন দল বা কোন ক্ষমতাধর নেতা ক্ষমতায় থাকছেন তাতে হেরফের ঘটছে না।
আমাদের রাজনীতিতেও কি এর প্রভাব পড়ছে?
ইসলামের বিরুদ্ধে পশ্চিমের এ ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ প্রধানত মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকাকে লক্ষ্য করে শুরু হলেও দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াও তার বাইরে আছে বলে মনে হয় না। সম্ভবত পশ্চিমকে সতর্ক করে দিতেই হান্টিংটন চীনকে ইসলামী সভ্যতার মিত্র এবং ভারতকে ‘গ্রে এরিয়া’ হিসেবে অনিশ্চিত অবস্থানে রেখেছেন। তাই পশ্চিমের তীক্ষè দৃষ্টি এখন এ দুটি দেশের দিকে। এ দুই দেশের সঙ্গে পশ্চিমের সম্পর্কের টানাপোড়েনে তার প্রতিফলন স্পষ্ট। এ দুই উদীয়মান পরাশক্তিকে ইসলাম ও মুসলমান থেকে দূরে সরিয়ে রাখা এখন যেন পশ্চিমের রণকৌশলের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে আছে। যার প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতেও পড়ছে বলে মনে হয়।
বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কোনো অর্থেই ইসলামবিরোধী দল নয়। অতীতে মার্ক্সবাদী রাজনীতি করেছেন এমন বেশ কিছু রাজনীতিক ও তাদের অনুসারীরা এ দলে যোগ দিয়েছেন। ধর্ম বিষয়ে তাদের কিছুটা উদাসীন থাকা অস্বাভাবিক নয়। তবে মূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা ব্যক্তি জীবনে তাদের ধর্মীয় পরিচয় দৃঢ়তার সঙ্গেই ধারণ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই তার দৃষ্টান্ত। রাজনীতিতে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র কথা জোরেশোরে বললেও।
কিন্তু আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বলয়ে অবস্থানকারী কিছু কিছু গোষ্ঠীর ‘ইসলাম বিদ্বেষ’ মোটেই অস্পষ্ট নয়। কেবল তা-ই নয়, এ দেশের ধর্মীয় ও নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোকে নিয়ে তাদের নানাবিধ রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মসূচি ও বক্তব্য অনেক ক্ষেত্রে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আহত করে। যার মাশুল দিতে হয় আওয়ামী লীগকেই।
মৌলবাদী ধর্মাচার যারা পালন করেন না, এমনকি যারা ধর্মহীন জীবন দর্শনের অনুসারী, তাদের দিক থেকেও মুসলমান বা ইসলামের সঙ্গে অযথা সাংঘর্ষিক অবস্থান তৈরি করা রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী। এর ফলে এ ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে কেবল যে সংশ্লিষ্ট দল-উপদল সম্পর্কে জনমনে বিরূপ মনোভাব গড়ে ওঠে তা-ই নয়, এ অপরিণামদর্শিতা দেশে কট্টর মৌলবাদের ভিত প্রসারিত করে। যা পরিণামে তথাকথিত ধর্মীয় ‘জঙ্গিবাদ’ বা ‘সন্ত্রাসবাদ’কে উস্কে দিয়ে হিতে বিপরীত ঘটাতে পারে।
বাংলাদেশে এখন সেই পরিস্থিতিই বিরাজ করছে।
‘ধর্মান্ধতা’ বনাম ‘ধর্মবিদ্বেষ’
এখন বাংলাদেশে একদিকে কট্টর ‘ধর্মান্ধতা’ এবং অপরদিকে চরম ‘ধর্মবিদ্বেষ’ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। এ ধর্মবিদ্বেষ কার্যক্ষেত্রে আবার শুধু ‘ইসলাম বিদ্বেষ’ (অন্য কোনো ধর্ম নয়)। আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছু দল-উপদল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের পাশ কাটিয়ে ‘সংখ্যালঘু রাজনীতি’র চর্চায় অনেক সময় ও শ্রম বিনিয়োগ করে থাকে। সংখ্যালঘুদের প্রতি সংবেদনশীল থাকা এবং তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার সংরক্ষণে সচেতন থাকা অবশ্যই উন্নত মনমানসিকতার পরিচায়ক। তবে জাতীয় রাজনীতিতে কোনো অর্থবহ অবদান রাখতে হলে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর চিন্তা-ভাবনা, পছন্দ-অপছন্দকে মূল্য দেয়া জরুরি। তাছাড়া কেউ যদি হতদরিদ্র মানুষের জন্য কাজ করতে চান, তাহলেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর হতদরিদ্র মানুষের কথা ভুলে থাকলে চলবে কেন? সারা দেশের কথা থাক, শুধু এ ঢাকা শহরে যতজন মানুষ ফুটপাতে বা বস্তিতে অবাসযোগ্য পরিবেশে অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবনযাপন করে, তাদের সংখ্যা সম্ভবত সারা দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সব মানুষের সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে। হতদরিদ্র মানুষ হিসেবে তাদেরও হিসাবে নিতে হবে। কেবল মুসলমান হওয়ার ‘অপরাধে’ তাদের হিসাবের বাইরে রেখে মানবতার কথা বলা যুক্তিসিদ্ধ নয়।
প্রয়োজন ‘হিন্দু-মুসলমানে’র ঐক্য
আরেকটি দিক থেকেও বিষয়টি ভাবতে হবে। বৃহত্তর মুসলমান জনগোষ্ঠী থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা কথিত ‘আদিবাসী’ সম্প্রদায়কে আলাদা করে রাখার বিপজ্জনক দিক এই যে, এতে করে একটি একক জাতীয় সত্তা গড়ে ওঠা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
দেশে একটি ‘হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ’ আছে। সদা সক্রিয়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবেই তার পরিচয়। ইদানীং বিএনপির সমর্থক অনুরূপ আরেকটি সংগঠনও দেখা যাচ্ছে- ‘হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কল্যাণ ঐক্য ফ্রন্ট’। এ দুই সংগঠনের লক্ষ্য কী? এ দেশের হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের আলাদা করে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে কেন? কাদের প্রতিপক্ষে এ ঐক্য? সংখ্যাগুরুর বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুর ঐক্য?
মুুসলমানের বিরুদ্ধে দেশের সব অমুসলিম সম্প্রদায়কে একত্র করার এ প্রয়াসে যারা উৎসাহ যোগাচ্ছেন তাদের মধ্যে দু’ধরনের লোক থাকতে পারেন। প্রথমত, কেউ হয়তো যথার্থই মানবতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অথবা সংখ্যালঘু হিসেবে অবহেলিত কিংবা পিছিয়ে থাকা মানুষের কল্যাণ চিন্তা থেকেই এতে ব্রতী হয়েছেন। পাশাপাশি ভিন্ন কোনো এজেন্ডায় সংখ্যালঘুদের ব্যবহার করার উদ্দেশ্য নিয়েও এ কাজটি হতে পারে। বাংলাদেশের জাতি গঠন প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশের এসব ক্ষুদ্রতর জনগোষ্ঠীকে মূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বৈরী অবস্থানে রাখার দূরভিসন্ধী থাকাও বিচিত্র নয়। আবার দুর্বলের সেবার নামে নিছক বৈষয়িক লাভের জন্য ‘প্রকল্প’ খাড়া করার লোকের অভাবও এ দেশে আছে বলে মনে হয় না।
মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের জনসমষ্টিতে ধর্মীয় বিভাজনে হিন্দু ও মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় তা হাজার বছর ধরেই কমবেশি চলে আসছে।
অবিভক্ত বাংলায় হিন্দু ও মুসলমানের সংখ্যা প্রায় সমান সমান ছিল। মুসলমানরা সংখ্যায় কিছুটা বেশি থাকলেও তাদের অধিকাংশই ছিল গ্রামীণ দরিদ্র কৃষক। ধন-সম্পদ, শিক্ষা এবং প্রভাব-প্রতিপত্তিতে হিন্দুরা ছিল অনেক এগিয়ে। বিশেষ করে আধুনিক বিদ্যাশিক্ষায় মুসলমানরা ছিল অনেক পিছিয়ে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক পর্যন্ত (১৯১২) ‘ব্রিটিশ ভারতের’ রাজধানী ছিল কলকাতা। সেখানে মুসলমানের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। ত্রিশের দশকে এসে কলকাতায় মুসলমানের সংখ্যা দৃষ্টিগোচর হতে থাকে। আর তখনই হিন্দু সমাজপতিরা তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব হওয়ার আশংকায় সংক্ষুব্ধ হতে থাকে। ১৯৩৫-এর ভারত শাসন আইনের অধীনে নির্বাচন হলে বাংলার বিধান সভায় মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিফলিত হতে থাকে। পরপর তিনজন প্রধানমন্ত্রীই হয়েছেন মুসলমান। ফলে হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক-রেষারেষি রাজনৈতিক বিভাজনে রূপান্তরিত হয়। যে বাঙালি হিন্দু ১৯০৫ সালে ‘বঙ্গভঙ্গ’ বাতিল করার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে, আÍঘাতী বোমা হামলায় প্রাণ দিয়েছে, তারাই আবার বাংলা বিভাগের জন্য লড়তে শুরু করেন। ফলে ১৯৪৭ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদে বাংলাকে ভাগ করা, না করার প্রশ্নে যখন ভোটাভুটি হয় তাতে মুসলমান সদস্যরা প্রায় সবাই যুক্ত বাংলার পক্ষে ভোট দেন, আর হিন্দু সদস্যদের প্রায় সবাই সাম্প্র্রদায়িক ভিত্তিতে বাংলাকে ভাগ করার পক্ষে রায় দেন। ফলে মুসলমান সদস্যদের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও হিন্দু সদস্যদের ভোটে বাংলা বিভাগ কার্যকর হয়। মুসলমানদের জন্য পূর্ব বাংলা, আর হিন্দুদের জন্য পশ্চিম বাংলা নির্ধারিত হয়ে গেল। একটি গেল দিল্লির অধীনে, আরেকটি পাকিস্তানে। উপমহাদেশে বাংলার অগ্রবর্তী অবস্থানটি চিরদিনের মতো হারিয়ে গেল।
এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় পূর্ব বাংলার বাঙালি হিন্দুরা। তাদের পিতৃপুরুষের ভিটামাটি ছেড়ে ভিন দেশে পাড়ি জমাতে হয় অবর্ণনীয় অত্যাচার ও দুঃখ-দুর্দশা মাথায় নিয়ে। যে পূর্ব বাংলায় একদা হিন্দুর জনসংখ্যা ছিল ৩০ শতাংশের বেশি, আজকের বাংলাদেশে তা ১০ শতাংশের নিচে।
সেই ‘দেশ বিভাগ’কালীন বৈরিতার জের এখনও থেমে যায়নি। তারই ধারাবাহিকতায় আজকের বাংলাদেশেও ধর্মীয় বিভাজনে মূল দ্বন্দ্ব হিন্দু ও মুসলমানের সেই বৈরিতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাস। বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান সম্প্রদায় এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক নয়। সংখ্যালঘু হওয়ার বিড়ম্বনা থাকলেও তাদের নিয়ে সে রকম কোনো সংকট নেই।
তাই আজকের বাংলাদেশে যদি ধর্মীয় সম্প্রীতির জন্য আন্দোলন করতে হয়, তা হওয়া প্রয়োজন হিন্দু ও মুসলমানের সম্প্রীতির জন্য। প্রয়োজন ‘হিন্দু-মুসলমান ঐক্য’; হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানের ঐক্য নয়। হিন্দু ও মুসলমানের দূরত্ব কমে এলেই এ দেশে এবং সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলজুড়ে মানুষে মানুষে সম্প্রীতির নবদিগন্ত উন্মোচিত হবে।
বাংলাদেশই তা থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে।
শেষ কথা
বাংলাদেশে এখন ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র নামে যা হচ্ছে তাতে কার্যত ‘ইসলাম বিরোধিতা’র প্রবণতাই অধিক পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ আত্মঘাতী প্রবণতারও অবসান হওয়া অত্যাবশ্যক।
যারা ধর্মাচার পালন করেন না, তাদের ‘ধর্মবিরোধী’ হওয়ার প্রয়োজন নেই। ভালো হিন্দু, ভালো মুসলমান, ভালো বৌদ্ধ কিংবা ভালো খ্রিস্টান- পরস্পরকে দূরে সরিয়ে নয়, পরস্পরকে গ্রহণ করার মধ্য দিয়েই কেবল যথার্থ ‘অসাম্প্রদায়িকতা’র চর্চা করতে পারেন।
‘ধর্মান্ধতা’ ও ‘ধর্মবিদ্বেষ’ কোনোটাই আধুনিকতা বা প্রগতিশীলতার ধারক হতে পারে না।
ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী : রাজনীতিক, ভূ-রাজনীতি ও উন্নয়ন গবেষক
shapshin@gtlbd.com
- See more at: http://www.jugantor.com/sub-editorial/2014/01/16/59206#sthash.wXnGEM7t.dpuf
ইসলাম বিরোধিতাই প্রগতিশীলতা নয়
ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী
প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি, ২০১৪
‘প্রগতিশীল’ বলতে আমরা কী বুঝব? ‘ইসলাম বিরোধিতা’ই কি প্রগতিশীলতা? ইসলাম ধর্ম এবং মহানবীকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা এবং মুসলমান পরিচয় যথাসম্ভব লুকিয়ে রাখাই কি আধুনিক ও প্রগতিশীল মননের পরিচায়ক?
‘ধর্মান্ধতা’ যেমন সমাজকে কুসংস্কার, অদৃষ্টবাদ ও অতীতচারিতায় আবদ্ধ করে স্থবির করে রাখে, তেমনি ‘অতি-প্রগতিশীল’ হতে গিয়ে ‘ধর্মবিদ্বেষী’ হয়ে ওঠাও কল্যাণ বয়ে আনে না। আমাদের জাতি গঠনের পথে তা বিরাট অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। অবশ্য কেউ যদি মনে করেন ‘জাতি’ থাকবে কেন, আমরা তো ‘আন্তর্জাতিকতা’য় বিশ্বাসী; অথবা মনে করেন, সারা দুনিয়ার সব জাতি বা রাষ্ট্রের সীমানা তুলে দিয়ে একক বিশ্বমানবতার বিজয় কেতন ওড়ানোর জন্যই আমাদের সংগ্রাম; তাহলে বলার কিছু থাকে না। কিন্তু যদি আমরা বর্তমানকালের ‘জাতি-রাষ্ট্র’ভিত্তিক বিশ্ব সমাজকে নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই, তাহলে অংকটা ভিন্নতর হতে হবে।
একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, ‘বিশ্বায়নে’র উচ্চকিত স্লোগান সত্ত্বেও আজকের দিনে বিভিন্ন জাতি-রাষ্ট্রের সীমান্ত প্রহরা ক্রমেই নিশ্ছিদ্র হয়ে উঠছে। জাতি-রাষ্ট্রের বিভাজন ও সীমান্ত রেখার এ নিশ্ছিদ্রকরণ বিশ্বমানবতার দৃষ্টিকোণ থেকে নেতিবাচক মনে হতে পারে, তবে ভূপৃষ্ঠের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণ, সামাজিক শৃংখলা প্রবর্তন এবং ব্যক্তির জাগতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনে ‘জাতি-রাষ্ট্র’গুলোকে যথাসম্ভব স্বনির্ভর ও সক্ষম করে তোলার বিকল্প নেই। ভূমি ও জনশক্তির ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকেও তা অপরিহার্য। এ অপরিহার্যতা আরও বেড়ে যায় যখন সীমিত সম্পদের সুষম বণ্টন এবং শক্তিমান জনগোষ্ঠী কর্তৃক দুর্বলতর জনগোষ্ঠীর সম্পদ লুণ্ঠনের অব্যাহত প্রক্রিয়া প্রতিহত করার বিষয়টি সামনে চলে আসে।
গত দুই দশকের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, কথিত ‘বিশ্বায়ন’ এবং তা থেকে উৎসারিত ‘মুক্তবাজার’ সবার জন্য পথচলা সমভাবে উন্মুক্ত করে না। এই ‘মুক্ত’ বাজারে মুষ্টিমেয় শক্তিমানের বিশ্বময় দাপিয়ে বেড়ানোর সুযোগ অবারিত হয়েছে বটে, কিন্তু তার বিপরীতে দুর্বলতর মানুষকে শক্তিমানের মাটিতে অন্তর্বাস খুলে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে (অতি সম্প্রতি এক ভারতীয় কূটনীতিকের দূরবস্থার বিষয়টি স্মর্তব্য)। এ অসম আদান-প্রদানকে ‘বিশ্বায়ন’ বলা পরিহাস ছাড়া আর কিছুই নয়। বাণিজ্য-উদ্বৃত্তের একমুখী প্রবাহকে ‘মুক্তবাজার’ আখ্যা দেয়াও সঠিক শব্দচয়ন নয়।
এ ‘বিশ্বায়ন’ ও ‘মুক্তবাজারে’র শেষ গন্তব্য পশ্চিমের কয়েকটি ধনকুবের দেশ। যাদের ধনের উৎস অতীতের সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক শাসন। তারই নতুন সংস্করণ এই ‘বিশ্বায়ন’ ও ‘মুক্তবাজার’। যার সুরক্ষায় উদ্ভাবিত হয়েছে একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতির নয়া মূলমন্ত্র- ‘সভ্যতার সংঘাত’ (Clash of civilization)-এর সভ্যতাবিনাশী তত্ত্ব। মার্কিন নব্য-রক্ষণশীলতার (Neo-con) এ প্রেসক্রিপশন মেনে নিয়েই নির্ধারিত হয়েছে পশ্চিমা শক্তির নয়া রণকৌশল।
Clash of civilization তত্ত্বের উদ্গাতা হান্টিংটন একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বকে দেখেছেন ‘পশ্চিমা সভ্যতা’র বিপরীতে ‘ইসলামী সভ্যতা’র নিরবচ্ছিন্ন লড়াই হিসেবে। এ লড়াইয়ে তিনি চীনকে দেখেছেন সরাসরি ইসলামী সভ্যতার মিত্র হিসেবে। আর রাশিয়া (অর্থডক্স ক্রিশ্চিয়ানিটি) এবং ভারতকে রেখেছেন দুয়ের বাইরে ধূসর অবস্থানে। ১৯৯০ সালের দিকে প্রথম প্রচারিত এ তত্ত্বেরই আক্ষরিক প্রয়োগ দেখা গেছে বিগত দুই দশকে পশ্চিমা কূটনীতি ও রণনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে। যার প্রয়োগ শুরু হয়েছে ইরাককে দিয়ে। অতঃপর আফগানিস্তান, লিবিয়া, মিসর, সিরিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়া, পাকিস্তান- একে একে গোটা মুসলিম বিশ্ব। এক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বা ইউরোপের দেশগুলোতে কোন দল বা কোন ক্ষমতাধর নেতা ক্ষমতায় থাকছেন তাতে হেরফের ঘটছে না।
আমাদের রাজনীতিতেও কি এর প্রভাব পড়ছে?
ইসলামের বিরুদ্ধে পশ্চিমের এ ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ প্রধানত মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকাকে লক্ষ্য করে শুরু হলেও দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াও তার বাইরে আছে বলে মনে হয় না। সম্ভবত পশ্চিমকে সতর্ক করে দিতেই হান্টিংটন চীনকে ইসলামী সভ্যতার মিত্র এবং ভারতকে ‘গ্রে এরিয়া’ হিসেবে অনিশ্চিত অবস্থানে রেখেছেন। তাই পশ্চিমের তীক্ষè দৃষ্টি এখন এ দুটি দেশের দিকে। এ দুই দেশের সঙ্গে পশ্চিমের সম্পর্কের টানাপোড়েনে তার প্রতিফলন স্পষ্ট। এ দুই উদীয়মান পরাশক্তিকে ইসলাম ও মুসলমান থেকে দূরে সরিয়ে রাখা এখন যেন পশ্চিমের রণকৌশলের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে আছে। যার প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতেও পড়ছে বলে মনে হয়।
বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কোনো অর্থেই ইসলামবিরোধী দল নয়। অতীতে মার্ক্সবাদী রাজনীতি করেছেন এমন বেশ কিছু রাজনীতিক ও তাদের অনুসারীরা এ দলে যোগ দিয়েছেন। ধর্ম বিষয়ে তাদের কিছুটা উদাসীন থাকা অস্বাভাবিক নয়। তবে মূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা ব্যক্তি জীবনে তাদের ধর্মীয় পরিচয় দৃঢ়তার সঙ্গেই ধারণ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই তার দৃষ্টান্ত। রাজনীতিতে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র কথা জোরেশোরে বললেও।
কিন্তু আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বলয়ে অবস্থানকারী কিছু কিছু গোষ্ঠীর ‘ইসলাম বিদ্বেষ’ মোটেই অস্পষ্ট নয়। কেবল তা-ই নয়, এ দেশের ধর্মীয় ও নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোকে নিয়ে তাদের নানাবিধ রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মসূচি ও বক্তব্য অনেক ক্ষেত্রে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আহত করে। যার মাশুল দিতে হয় আওয়ামী লীগকেই।
মৌলবাদী ধর্মাচার যারা পালন করেন না, এমনকি যারা ধর্মহীন জীবন দর্শনের অনুসারী, তাদের দিক থেকেও মুসলমান বা ইসলামের সঙ্গে অযথা সাংঘর্ষিক অবস্থান তৈরি করা রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী। এর ফলে এ ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে কেবল যে সংশ্লিষ্ট দল-উপদল সম্পর্কে জনমনে বিরূপ মনোভাব গড়ে ওঠে তা-ই নয়, এ অপরিণামদর্শিতা দেশে কট্টর মৌলবাদের ভিত প্রসারিত করে। যা পরিণামে তথাকথিত ধর্মীয় ‘জঙ্গিবাদ’ বা ‘সন্ত্রাসবাদ’কে উস্কে দিয়ে হিতে বিপরীত ঘটাতে পারে।
বাংলাদেশে এখন সেই পরিস্থিতিই বিরাজ করছে।
‘ধর্মান্ধতা’ বনাম ‘ধর্মবিদ্বেষ’
এখন বাংলাদেশে একদিকে কট্টর ‘ধর্মান্ধতা’ এবং অপরদিকে চরম ‘ধর্মবিদ্বেষ’ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। এ ধর্মবিদ্বেষ কার্যক্ষেত্রে আবার শুধু ‘ইসলাম বিদ্বেষ’ (অন্য কোনো ধর্ম নয়)। আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছু দল-উপদল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের পাশ কাটিয়ে ‘সংখ্যালঘু রাজনীতি’র চর্চায় অনেক সময় ও শ্রম বিনিয়োগ করে থাকে। সংখ্যালঘুদের প্রতি সংবেদনশীল থাকা এবং তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার সংরক্ষণে সচেতন থাকা অবশ্যই উন্নত মনমানসিকতার পরিচায়ক। তবে জাতীয় রাজনীতিতে কোনো অর্থবহ অবদান রাখতে হলে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর চিন্তা-ভাবনা, পছন্দ-অপছন্দকে মূল্য দেয়া জরুরি। তাছাড়া কেউ যদি হতদরিদ্র মানুষের জন্য কাজ করতে চান, তাহলেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর হতদরিদ্র মানুষের কথা ভুলে থাকলে চলবে কেন? সারা দেশের কথা থাক, শুধু এ ঢাকা শহরে যতজন মানুষ ফুটপাতে বা বস্তিতে অবাসযোগ্য পরিবেশে অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবনযাপন করে, তাদের সংখ্যা সম্ভবত সারা দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সব মানুষের সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে। হতদরিদ্র মানুষ হিসেবে তাদেরও হিসাবে নিতে হবে। কেবল মুসলমান হওয়ার ‘অপরাধে’ তাদের হিসাবের বাইরে রেখে মানবতার কথা বলা যুক্তিসিদ্ধ নয়।
প্রয়োজন ‘হিন্দু-মুসলমানে’র ঐক্য
আরেকটি দিক থেকেও বিষয়টি ভাবতে হবে। বৃহত্তর মুসলমান জনগোষ্ঠী থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা কথিত ‘আদিবাসী’ সম্প্রদায়কে আলাদা করে রাখার বিপজ্জনক দিক এই যে, এতে করে একটি একক জাতীয় সত্তা গড়ে ওঠা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
দেশে একটি ‘হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ’ আছে। সদা সক্রিয়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবেই তার পরিচয়। ইদানীং বিএনপির সমর্থক অনুরূপ আরেকটি সংগঠনও দেখা যাচ্ছে- ‘হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কল্যাণ ঐক্য ফ্রন্ট’। এ দুই সংগঠনের লক্ষ্য কী? এ দেশের হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের আলাদা করে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে কেন? কাদের প্রতিপক্ষে এ ঐক্য? সংখ্যাগুরুর বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুর ঐক্য?
মুুসলমানের বিরুদ্ধে দেশের সব অমুসলিম সম্প্রদায়কে একত্র করার এ প্রয়াসে যারা উৎসাহ যোগাচ্ছেন তাদের মধ্যে দু’ধরনের লোক থাকতে পারেন। প্রথমত, কেউ হয়তো যথার্থই মানবতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অথবা সংখ্যালঘু হিসেবে অবহেলিত কিংবা পিছিয়ে থাকা মানুষের কল্যাণ চিন্তা থেকেই এতে ব্রতী হয়েছেন। পাশাপাশি ভিন্ন কোনো এজেন্ডায় সংখ্যালঘুদের ব্যবহার করার উদ্দেশ্য নিয়েও এ কাজটি হতে পারে। বাংলাদেশের জাতি গঠন প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশের এসব ক্ষুদ্রতর জনগোষ্ঠীকে মূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বৈরী অবস্থানে রাখার দূরভিসন্ধী থাকাও বিচিত্র নয়। আবার দুর্বলের সেবার নামে নিছক বৈষয়িক লাভের জন্য ‘প্রকল্প’ খাড়া করার লোকের অভাবও এ দেশে আছে বলে মনে হয় না।
মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের জনসমষ্টিতে ধর্মীয় বিভাজনে হিন্দু ও মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় তা হাজার বছর ধরেই কমবেশি চলে আসছে।
অবিভক্ত বাংলায় হিন্দু ও মুসলমানের সংখ্যা প্রায় সমান সমান ছিল। মুসলমানরা সংখ্যায় কিছুটা বেশি থাকলেও তাদের অধিকাংশই ছিল গ্রামীণ দরিদ্র কৃষক। ধন-সম্পদ, শিক্ষা এবং প্রভাব-প্রতিপত্তিতে হিন্দুরা ছিল অনেক এগিয়ে। বিশেষ করে আধুনিক বিদ্যাশিক্ষায় মুসলমানরা ছিল অনেক পিছিয়ে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক পর্যন্ত (১৯১২) ‘ব্রিটিশ ভারতের’ রাজধানী ছিল কলকাতা। সেখানে মুসলমানের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। ত্রিশের দশকে এসে কলকাতায় মুসলমানের সংখ্যা দৃষ্টিগোচর হতে থাকে। আর তখনই হিন্দু সমাজপতিরা তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব হওয়ার আশংকায় সংক্ষুব্ধ হতে থাকে। ১৯৩৫-এর ভারত শাসন আইনের অধীনে নির্বাচন হলে বাংলার বিধান সভায় মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিফলিত হতে থাকে। পরপর তিনজন প্রধানমন্ত্রীই হয়েছেন মুসলমান। ফলে হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক-রেষারেষি রাজনৈতিক বিভাজনে রূপান্তরিত হয়। যে বাঙালি হিন্দু ১৯০৫ সালে ‘বঙ্গভঙ্গ’ বাতিল করার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে, আÍঘাতী বোমা হামলায় প্রাণ দিয়েছে, তারাই আবার বাংলা বিভাগের জন্য লড়তে শুরু করেন। ফলে ১৯৪৭ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদে বাংলাকে ভাগ করা, না করার প্রশ্নে যখন ভোটাভুটি হয় তাতে মুসলমান সদস্যরা প্রায় সবাই যুক্ত বাংলার পক্ষে ভোট দেন, আর হিন্দু সদস্যদের প্রায় সবাই সাম্প্র্রদায়িক ভিত্তিতে বাংলাকে ভাগ করার পক্ষে রায় দেন। ফলে মুসলমান সদস্যদের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও হিন্দু সদস্যদের ভোটে বাংলা বিভাগ কার্যকর হয়। মুসলমানদের জন্য পূর্ব বাংলা, আর হিন্দুদের জন্য পশ্চিম বাংলা নির্ধারিত হয়ে গেল। একটি গেল দিল্লির অধীনে, আরেকটি পাকিস্তানে। উপমহাদেশে বাংলার অগ্রবর্তী অবস্থানটি চিরদিনের মতো হারিয়ে গেল।
এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় পূর্ব বাংলার বাঙালি হিন্দুরা। তাদের পিতৃপুরুষের ভিটামাটি ছেড়ে ভিন দেশে পাড়ি জমাতে হয় অবর্ণনীয় অত্যাচার ও দুঃখ-দুর্দশা মাথায় নিয়ে। যে পূর্ব বাংলায় একদা হিন্দুর জনসংখ্যা ছিল ৩০ শতাংশের বেশি, আজকের বাংলাদেশে তা ১০ শতাংশের নিচে।
সেই ‘দেশ বিভাগ’কালীন বৈরিতার জের এখনও থেমে যায়নি। তারই ধারাবাহিকতায় আজকের বাংলাদেশেও ধর্মীয় বিভাজনে মূল দ্বন্দ্ব হিন্দু ও মুসলমানের সেই বৈরিতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাস। বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান সম্প্রদায় এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক নয়। সংখ্যালঘু হওয়ার বিড়ম্বনা থাকলেও তাদের নিয়ে সে রকম কোনো সংকট নেই।
তাই আজকের বাংলাদেশে যদি ধর্মীয় সম্প্রীতির জন্য আন্দোলন করতে হয়, তা হওয়া প্রয়োজন হিন্দু ও মুসলমানের সম্প্রীতির জন্য। প্রয়োজন ‘হিন্দু-মুসলমান ঐক্য’; হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানের ঐক্য নয়। হিন্দু ও মুসলমানের দূরত্ব কমে এলেই এ দেশে এবং সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলজুড়ে মানুষে মানুষে সম্প্রীতির নবদিগন্ত উন্মোচিত হবে।
বাংলাদেশই তা থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে।
শেষ কথা
বাংলাদেশে এখন ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র নামে যা হচ্ছে তাতে কার্যত ‘ইসলাম বিরোধিতা’র প্রবণতাই অধিক পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ আত্মঘাতী প্রবণতারও অবসান হওয়া অত্যাবশ্যক।
যারা ধর্মাচার পালন করেন না, তাদের ‘ধর্মবিরোধী’ হওয়ার প্রয়োজন নেই। ভালো হিন্দু, ভালো মুসলমান, ভালো বৌদ্ধ কিংবা ভালো খ্রিস্টান- পরস্পরকে দূরে সরিয়ে নয়, পরস্পরকে গ্রহণ করার মধ্য দিয়েই কেবল যথার্থ ‘অসাম্প্রদায়িকতা’র চর্চা করতে পারেন।
‘ধর্মান্ধতা’ ও ‘ধর্মবিদ্বেষ’ কোনোটাই আধুনিকতা বা প্রগতিশীলতার ধারক হতে পারে না।
ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী : রাজনীতিক, ভূ-রাজনীতি ও উন্নয়ন গবেষক
shapshin@gtlbd.com
ইসলাম বিরোধিতাই প্রগতিশীলতা নয়
ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী
প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি, ২০১৪
‘প্রগতিশীল’ বলতে আমরা কী বুঝব? ‘ইসলাম বিরোধিতা’ই কি প্রগতিশীলতা? ইসলাম ধর্ম এবং মহানবীকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা এবং মুসলমান পরিচয় যথাসম্ভব লুকিয়ে রাখাই কি আধুনিক ও প্রগতিশীল মননের পরিচায়ক?
‘ধর্মান্ধতা’ যেমন সমাজকে কুসংস্কার, অদৃষ্টবাদ ও অতীতচারিতায় আবদ্ধ করে স্থবির করে রাখে, তেমনি ‘অতি-প্রগতিশীল’ হতে গিয়ে ‘ধর্মবিদ্বেষী’ হয়ে ওঠাও কল্যাণ বয়ে আনে না। আমাদের জাতি গঠনের পথে তা বিরাট অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। অবশ্য কেউ যদি মনে করেন ‘জাতি’ থাকবে কেন, আমরা তো ‘আন্তর্জাতিকতা’য় বিশ্বাসী; অথবা মনে করেন, সারা দুনিয়ার সব জাতি বা রাষ্ট্রের সীমানা তুলে দিয়ে একক বিশ্বমানবতার বিজয় কেতন ওড়ানোর জন্যই আমাদের সংগ্রাম; তাহলে বলার কিছু থাকে না। কিন্তু যদি আমরা বর্তমানকালের ‘জাতি-রাষ্ট্র’ভিত্তিক বিশ্ব সমাজকে নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই, তাহলে অংকটা ভিন্নতর হতে হবে।
একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, ‘বিশ্বায়নে’র উচ্চকিত স্লোগান সত্ত্বেও আজকের দিনে বিভিন্ন জাতি-রাষ্ট্রের সীমান্ত প্রহরা ক্রমেই নিশ্ছিদ্র হয়ে উঠছে। জাতি-রাষ্ট্রের বিভাজন ও সীমান্ত রেখার এ নিশ্ছিদ্রকরণ বিশ্বমানবতার দৃষ্টিকোণ থেকে নেতিবাচক মনে হতে পারে, তবে ভূপৃষ্ঠের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণ, সামাজিক শৃংখলা প্রবর্তন এবং ব্যক্তির জাগতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনে ‘জাতি-রাষ্ট্র’গুলোকে যথাসম্ভব স্বনির্ভর ও সক্ষম করে তোলার বিকল্প নেই। ভূমি ও জনশক্তির ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকেও তা অপরিহার্য। এ অপরিহার্যতা আরও বেড়ে যায় যখন সীমিত সম্পদের সুষম বণ্টন এবং শক্তিমান জনগোষ্ঠী কর্তৃক দুর্বলতর জনগোষ্ঠীর সম্পদ লুণ্ঠনের অব্যাহত প্রক্রিয়া প্রতিহত করার বিষয়টি সামনে চলে আসে।
গত দুই দশকের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, কথিত ‘বিশ্বায়ন’ এবং তা থেকে উৎসারিত ‘মুক্তবাজার’ সবার জন্য পথচলা সমভাবে উন্মুক্ত করে না। এই ‘মুক্ত’ বাজারে মুষ্টিমেয় শক্তিমানের বিশ্বময় দাপিয়ে বেড়ানোর সুযোগ অবারিত হয়েছে বটে, কিন্তু তার বিপরীতে দুর্বলতর মানুষকে শক্তিমানের মাটিতে অন্তর্বাস খুলে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে (অতি সম্প্রতি এক ভারতীয় কূটনীতিকের দূরবস্থার বিষয়টি স্মর্তব্য)। এ অসম আদান-প্রদানকে ‘বিশ্বায়ন’ বলা পরিহাস ছাড়া আর কিছুই নয়। বাণিজ্য-উদ্বৃত্তের একমুখী প্রবাহকে ‘মুক্তবাজার’ আখ্যা দেয়াও সঠিক শব্দচয়ন নয়।
এ ‘বিশ্বায়ন’ ও ‘মুক্তবাজারে’র শেষ গন্তব্য পশ্চিমের কয়েকটি ধনকুবের দেশ। যাদের ধনের উৎস অতীতের সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক শাসন। তারই নতুন সংস্করণ এই ‘বিশ্বায়ন’ ও ‘মুক্তবাজার’। যার সুরক্ষায় উদ্ভাবিত হয়েছে একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতির নয়া মূলমন্ত্র- ‘সভ্যতার সংঘাত’ (Clash of civilization)-এর সভ্যতাবিনাশী তত্ত্ব। মার্কিন নব্য-রক্ষণশীলতার (Neo-con) এ প্রেসক্রিপশন মেনে নিয়েই নির্ধারিত হয়েছে পশ্চিমা শক্তির নয়া রণকৌশল।
Clash of civilization তত্ত্বের উদ্গাতা হান্টিংটন একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বকে দেখেছেন ‘পশ্চিমা সভ্যতা’র বিপরীতে ‘ইসলামী সভ্যতা’র নিরবচ্ছিন্ন লড়াই হিসেবে। এ লড়াইয়ে তিনি চীনকে দেখেছেন সরাসরি ইসলামী সভ্যতার মিত্র হিসেবে। আর রাশিয়া (অর্থডক্স ক্রিশ্চিয়ানিটি) এবং ভারতকে রেখেছেন দুয়ের বাইরে ধূসর অবস্থানে। ১৯৯০ সালের দিকে প্রথম প্রচারিত এ তত্ত্বেরই আক্ষরিক প্রয়োগ দেখা গেছে বিগত দুই দশকে পশ্চিমা কূটনীতি ও রণনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে। যার প্রয়োগ শুরু হয়েছে ইরাককে দিয়ে। অতঃপর আফগানিস্তান, লিবিয়া, মিসর, সিরিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়া, পাকিস্তান- একে একে গোটা মুসলিম বিশ্ব। এক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বা ইউরোপের দেশগুলোতে কোন দল বা কোন ক্ষমতাধর নেতা ক্ষমতায় থাকছেন তাতে হেরফের ঘটছে না।
আমাদের রাজনীতিতেও কি এর প্রভাব পড়ছে?
ইসলামের বিরুদ্ধে পশ্চিমের এ ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ প্রধানত মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকাকে লক্ষ্য করে শুরু হলেও দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াও তার বাইরে আছে বলে মনে হয় না। সম্ভবত পশ্চিমকে সতর্ক করে দিতেই হান্টিংটন চীনকে ইসলামী সভ্যতার মিত্র এবং ভারতকে ‘গ্রে এরিয়া’ হিসেবে অনিশ্চিত অবস্থানে রেখেছেন। তাই পশ্চিমের তীক্ষè দৃষ্টি এখন এ দুটি দেশের দিকে। এ দুই দেশের সঙ্গে পশ্চিমের সম্পর্কের টানাপোড়েনে তার প্রতিফলন স্পষ্ট। এ দুই উদীয়মান পরাশক্তিকে ইসলাম ও মুসলমান থেকে দূরে সরিয়ে রাখা এখন যেন পশ্চিমের রণকৌশলের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে আছে। যার প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতেও পড়ছে বলে মনে হয়।
বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কোনো অর্থেই ইসলামবিরোধী দল নয়। অতীতে মার্ক্সবাদী রাজনীতি করেছেন এমন বেশ কিছু রাজনীতিক ও তাদের অনুসারীরা এ দলে যোগ দিয়েছেন। ধর্ম বিষয়ে তাদের কিছুটা উদাসীন থাকা অস্বাভাবিক নয়। তবে মূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা ব্যক্তি জীবনে তাদের ধর্মীয় পরিচয় দৃঢ়তার সঙ্গেই ধারণ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই তার দৃষ্টান্ত। রাজনীতিতে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র কথা জোরেশোরে বললেও।
কিন্তু আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বলয়ে অবস্থানকারী কিছু কিছু গোষ্ঠীর ‘ইসলাম বিদ্বেষ’ মোটেই অস্পষ্ট নয়। কেবল তা-ই নয়, এ দেশের ধর্মীয় ও নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোকে নিয়ে তাদের নানাবিধ রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মসূচি ও বক্তব্য অনেক ক্ষেত্রে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আহত করে। যার মাশুল দিতে হয় আওয়ামী লীগকেই।
মৌলবাদী ধর্মাচার যারা পালন করেন না, এমনকি যারা ধর্মহীন জীবন দর্শনের অনুসারী, তাদের দিক থেকেও মুসলমান বা ইসলামের সঙ্গে অযথা সাংঘর্ষিক অবস্থান তৈরি করা রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী। এর ফলে এ ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে কেবল যে সংশ্লিষ্ট দল-উপদল সম্পর্কে জনমনে বিরূপ মনোভাব গড়ে ওঠে তা-ই নয়, এ অপরিণামদর্শিতা দেশে কট্টর মৌলবাদের ভিত প্রসারিত করে। যা পরিণামে তথাকথিত ধর্মীয় ‘জঙ্গিবাদ’ বা ‘সন্ত্রাসবাদ’কে উস্কে দিয়ে হিতে বিপরীত ঘটাতে পারে।
বাংলাদেশে এখন সেই পরিস্থিতিই বিরাজ করছে।
‘ধর্মান্ধতা’ বনাম ‘ধর্মবিদ্বেষ’
এখন বাংলাদেশে একদিকে কট্টর ‘ধর্মান্ধতা’ এবং অপরদিকে চরম ‘ধর্মবিদ্বেষ’ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। এ ধর্মবিদ্বেষ কার্যক্ষেত্রে আবার শুধু ‘ইসলাম বিদ্বেষ’ (অন্য কোনো ধর্ম নয়)। আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছু দল-উপদল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের পাশ কাটিয়ে ‘সংখ্যালঘু রাজনীতি’র চর্চায় অনেক সময় ও শ্রম বিনিয়োগ করে থাকে। সংখ্যালঘুদের প্রতি সংবেদনশীল থাকা এবং তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার সংরক্ষণে সচেতন থাকা অবশ্যই উন্নত মনমানসিকতার পরিচায়ক। তবে জাতীয় রাজনীতিতে কোনো অর্থবহ অবদান রাখতে হলে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর চিন্তা-ভাবনা, পছন্দ-অপছন্দকে মূল্য দেয়া জরুরি। তাছাড়া কেউ যদি হতদরিদ্র মানুষের জন্য কাজ করতে চান, তাহলেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর হতদরিদ্র মানুষের কথা ভুলে থাকলে চলবে কেন? সারা দেশের কথা থাক, শুধু এ ঢাকা শহরে যতজন মানুষ ফুটপাতে বা বস্তিতে অবাসযোগ্য পরিবেশে অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবনযাপন করে, তাদের সংখ্যা সম্ভবত সারা দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সব মানুষের সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে। হতদরিদ্র মানুষ হিসেবে তাদেরও হিসাবে নিতে হবে। কেবল মুসলমান হওয়ার ‘অপরাধে’ তাদের হিসাবের বাইরে রেখে মানবতার কথা বলা যুক্তিসিদ্ধ নয়।
প্রয়োজন ‘হিন্দু-মুসলমানে’র ঐক্য
আরেকটি দিক থেকেও বিষয়টি ভাবতে হবে। বৃহত্তর মুসলমান জনগোষ্ঠী থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা কথিত ‘আদিবাসী’ সম্প্রদায়কে আলাদা করে রাখার বিপজ্জনক দিক এই যে, এতে করে একটি একক জাতীয় সত্তা গড়ে ওঠা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
দেশে একটি ‘হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ’ আছে। সদা সক্রিয়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবেই তার পরিচয়। ইদানীং বিএনপির সমর্থক অনুরূপ আরেকটি সংগঠনও দেখা যাচ্ছে- ‘হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কল্যাণ ঐক্য ফ্রন্ট’। এ দুই সংগঠনের লক্ষ্য কী? এ দেশের হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের আলাদা করে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে কেন? কাদের প্রতিপক্ষে এ ঐক্য? সংখ্যাগুরুর বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুর ঐক্য?
মুুসলমানের বিরুদ্ধে দেশের সব অমুসলিম সম্প্রদায়কে একত্র করার এ প্রয়াসে যারা উৎসাহ যোগাচ্ছেন তাদের মধ্যে দু’ধরনের লোক থাকতে পারেন। প্রথমত, কেউ হয়তো যথার্থই মানবতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অথবা সংখ্যালঘু হিসেবে অবহেলিত কিংবা পিছিয়ে থাকা মানুষের কল্যাণ চিন্তা থেকেই এতে ব্রতী হয়েছেন। পাশাপাশি ভিন্ন কোনো এজেন্ডায় সংখ্যালঘুদের ব্যবহার করার উদ্দেশ্য নিয়েও এ কাজটি হতে পারে। বাংলাদেশের জাতি গঠন প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশের এসব ক্ষুদ্রতর জনগোষ্ঠীকে মূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বৈরী অবস্থানে রাখার দূরভিসন্ধী থাকাও বিচিত্র নয়। আবার দুর্বলের সেবার নামে নিছক বৈষয়িক লাভের জন্য ‘প্রকল্প’ খাড়া করার লোকের অভাবও এ দেশে আছে বলে মনে হয় না।
মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের জনসমষ্টিতে ধর্মীয় বিভাজনে হিন্দু ও মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় তা হাজার বছর ধরেই কমবেশি চলে আসছে।
অবিভক্ত বাংলায় হিন্দু ও মুসলমানের সংখ্যা প্রায় সমান সমান ছিল। মুসলমানরা সংখ্যায় কিছুটা বেশি থাকলেও তাদের অধিকাংশই ছিল গ্রামীণ দরিদ্র কৃষক। ধন-সম্পদ, শিক্ষা এবং প্রভাব-প্রতিপত্তিতে হিন্দুরা ছিল অনেক এগিয়ে। বিশেষ করে আধুনিক বিদ্যাশিক্ষায় মুসলমানরা ছিল অনেক পিছিয়ে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক পর্যন্ত (১৯১২) ‘ব্রিটিশ ভারতের’ রাজধানী ছিল কলকাতা। সেখানে মুসলমানের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। ত্রিশের দশকে এসে কলকাতায় মুসলমানের সংখ্যা দৃষ্টিগোচর হতে থাকে। আর তখনই হিন্দু সমাজপতিরা তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব হওয়ার আশংকায় সংক্ষুব্ধ হতে থাকে। ১৯৩৫-এর ভারত শাসন আইনের অধীনে নির্বাচন হলে বাংলার বিধান সভায় মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিফলিত হতে থাকে। পরপর তিনজন প্রধানমন্ত্রীই হয়েছেন মুসলমান। ফলে হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক-রেষারেষি রাজনৈতিক বিভাজনে রূপান্তরিত হয়। যে বাঙালি হিন্দু ১৯০৫ সালে ‘বঙ্গভঙ্গ’ বাতিল করার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে, আÍঘাতী বোমা হামলায় প্রাণ দিয়েছে, তারাই আবার বাংলা বিভাগের জন্য লড়তে শুরু করেন। ফলে ১৯৪৭ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদে বাংলাকে ভাগ করা, না করার প্রশ্নে যখন ভোটাভুটি হয় তাতে মুসলমান সদস্যরা প্রায় সবাই যুক্ত বাংলার পক্ষে ভোট দেন, আর হিন্দু সদস্যদের প্রায় সবাই সাম্প্র্রদায়িক ভিত্তিতে বাংলাকে ভাগ করার পক্ষে রায় দেন। ফলে মুসলমান সদস্যদের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও হিন্দু সদস্যদের ভোটে বাংলা বিভাগ কার্যকর হয়। মুসলমানদের জন্য পূর্ব বাংলা, আর হিন্দুদের জন্য পশ্চিম বাংলা নির্ধারিত হয়ে গেল। একটি গেল দিল্লির অধীনে, আরেকটি পাকিস্তানে। উপমহাদেশে বাংলার অগ্রবর্তী অবস্থানটি চিরদিনের মতো হারিয়ে গেল।
এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় পূর্ব বাংলার বাঙালি হিন্দুরা। তাদের পিতৃপুরুষের ভিটামাটি ছেড়ে ভিন দেশে পাড়ি জমাতে হয় অবর্ণনীয় অত্যাচার ও দুঃখ-দুর্দশা মাথায় নিয়ে। যে পূর্ব বাংলায় একদা হিন্দুর জনসংখ্যা ছিল ৩০ শতাংশের বেশি, আজকের বাংলাদেশে তা ১০ শতাংশের নিচে।
সেই ‘দেশ বিভাগ’কালীন বৈরিতার জের এখনও থেমে যায়নি। তারই ধারাবাহিকতায় আজকের বাংলাদেশেও ধর্মীয় বিভাজনে মূল দ্বন্দ্ব হিন্দু ও মুসলমানের সেই বৈরিতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাস। বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান সম্প্রদায় এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক নয়। সংখ্যালঘু হওয়ার বিড়ম্বনা থাকলেও তাদের নিয়ে সে রকম কোনো সংকট নেই।
তাই আজকের বাংলাদেশে যদি ধর্মীয় সম্প্রীতির জন্য আন্দোলন করতে হয়, তা হওয়া প্রয়োজন হিন্দু ও মুসলমানের সম্প্রীতির জন্য। প্রয়োজন ‘হিন্দু-মুসলমান ঐক্য’; হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানের ঐক্য নয়। হিন্দু ও মুসলমানের দূরত্ব কমে এলেই এ দেশে এবং সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলজুড়ে মানুষে মানুষে সম্প্রীতির নবদিগন্ত উন্মোচিত হবে।
বাংলাদেশই তা থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে।
শেষ কথা
বাংলাদেশে এখন ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র নামে যা হচ্ছে তাতে কার্যত ‘ইসলাম বিরোধিতা’র প্রবণতাই অধিক পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ আত্মঘাতী প্রবণতারও অবসান হওয়া অত্যাবশ্যক।
যারা ধর্মাচার পালন করেন না, তাদের ‘ধর্মবিরোধী’ হওয়ার প্রয়োজন নেই। ভালো হিন্দু, ভালো মুসলমান, ভালো বৌদ্ধ কিংবা ভালো খ্রিস্টান- পরস্পরকে দূরে সরিয়ে নয়, পরস্পরকে গ্রহণ করার মধ্য দিয়েই কেবল যথার্থ ‘অসাম্প্রদায়িকতা’র চর্চা করতে পারেন।
‘ধর্মান্ধতা’ ও ‘ধর্মবিদ্বেষ’ কোনোটাই আধুনিকতা বা প্রগতিশীলতার ধারক হতে পারে না।
ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী : রাজনীতিক, ভূ-রাজনীতি ও উন্নয়ন গবেষক
shapshin@gtlbd.com
বিষয় সমূহঃ >আল কোরআন/আরবী থেকে-বাংলা-ইংরেজী সহ<+>ইসলাম< +>আদর্শ নারী Adarsha Nari <+>নারী পুরুষের যৌন সমস্যা সমাধান<+>নারীস্বাস্থ্য সমস্যা ও পরামর্শ<+>মাসিক মনোজগত<+>যৌন শিক্ষা/যৌন মিলন/জন্মনিয়ন্ত্রন<+>ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর কর্তব্য ও মধুর মিলন।<+>কামসূত্র (সংক্ষিপ্ত)<+>দাম্পত্য জীবন/বিবাহ<+>কারবালার করুণ ইতিহাস<+>ডাঃজাকির নায়েকের লেকচার।<+>কম্পিউটার/মোবাইল/ইন্টারনেট<+>সর্বাধিক পঠিত<+>সোনা মনিদের মজার মজার গল্পের ভাণ্ডার(আন লিমিটেড)<+>হাসির দুনিয়া -কৌতুক এবং জোকস(আন লিমিটেড)<+>এই পোস্ট গুলি কি আপনি পড়েছেন?<+>আমাদের রাজনিতি/মিডিয়া <
আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুণ।
এই ব্লগে পড়তে কি সমস্যা হয়?আপনার কি টাকা বেশি খরচ হয়ে যায়?
সর্বশ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী আল্লাহ্
প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না
ভাষান্তর : মোঃ মাহমুদ ইবনে গাফফার
সম্পাদনা : আব্দ আল-আহাদ
ওয়েব সম্পাদনা : মোঃ মাহমুদ ইবনে গাফফার
কোরআন আল-কারীমে আল্লাহ্ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন : সম্পাদনা : আব্দ আল-আহাদ
ওয়েব সম্পাদনা : মোঃ মাহমুদ ইবনে গাফফার
“বস্তুত তোমরা এমন বিষয়কে অপছন্দ করছো যা তোমাদের পক্ষে বাস্তবিকই মঙ্গলজনক। পক্ষান্তরে, তোমরা এমন বিষয়কে পছন্দ করছো যা তোমাদের জন্য বাস্তবিকই অনিষ্টকর এবং আল্লাহ্ই অবগত আছেন আর তোমরা অবগত নও।” [সূরা বাকারাহ্; ২ : ২১৬]আমরা উল্লিখিত আয়াতের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করব যা আমাদের সকলেরই উপকারে আসবে, ইনশাআল্লাহ্।
আপনি আল্লাহ্র পরিকল্পনার বাইরে নন :
“অবস্থা দৃষ্টে ঘটনা একরকম মনে হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘটে তার উল্টোটা।
মুসাকে (আ) নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার জন্যে তাঁর মাকে নির্দেশ দেওয়া
হয়েছিল; ইউসুফকে (আ) মেরে ফেলার জন্যে কূপে নিক্ষেপ করা হয়েছিল; ঈসার (আ)
মা
মারইয়াম কোন পুরুষের স্পর্শ ছাড়াই অলৌকিকভাবে সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন;
আয়েশাকে (রা) মিথ্যা কলঙ্কে অভিযুক্ত করা হয়েছিল; ইউনুসকে (আ) তিমি মাছ
গিলে ফেলেছিল; ইব্রাহীমকে (আ) আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল; মুহাম্মাদ (সা)
এর প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজার (রা)মৃত্যু
বরণ করা; সালামাহ্ (রা) ভেবেছিলেন যে, আবু সালামাহ্ (রা) থেকে উত্তম আর
কেউ হতে পারবে না; একবার ভেবে দেখুন তো, এই ঘটনাগুলো ঘটার সময় লোকেরা কী
ভেবেছিল আর পরবর্তীতে ঘটনাগুলো কোন দিকে মোড় নিয়েছিল!!
অতএব, দুশ্চিন্তা করবেন না। আপনার জন্যও রয়েছে আল্লাহ্ রাব্বুল ‘আলামীনের পরিকল্পনা। [উৎস : অজ্ঞাত]
আমরা তা-ই চাই, যা আমরা পছন্দ করি। কিন্তু আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তা-ই ঘটান যা তিনি ইচ্ছা করেন।
অনেকদিন আগের এক ঘটনা। ইসরাইলের এক সাবেক রাজার বেশ কয়েকজন ছেলে ছিল। ছেলেদের কেউ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সাথে সাথেই নিজেকে মোটা কাপড়ের তৈরি পোশাকে জড়িয়ে চলে যেত পাহাড়ের গুহায় ইবাদতে
মগ্ন লোকদের দলে যোগ দেয়ার জন্য। যতদিন বেঁচে থাকত এভাবেই ইবাদত বন্দেগী
করতে থাকত তারা। রাজা তার ছেলেদেরকে কখনোই এভাবে পাহাড়ে যেতে বাঁধা দেননি।
কারন তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, আল্লাহ্ই তার ছেলেদের সত্যের পথে
পরিচালিত করছেন। তাদের হৃদয়কে বদলানোর ক্ষমতা তার নেই।
কিন্তু বৃদ্ধবয়সে উপনীত রাজা তার সর্বশেষ ছেলের পাহাড়ে যাওয়ার ব্যাপারে মত পরিবর্তন করলেন।
তিনি সকল মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের নিয়ে জরুরী বৈঠক ডাকলেন এবং বললেন, “আমি
আমার এই ছেলেকে অন্য ছেলেদের থেকে অনেক বেশী ভালোবাসি। আমার মনে হচ্ছে আমি
আর বেশীদিন বাঁচব না। আমার ভয়
হচ্ছে, সে যদি তার ভাইদের সাথে গিয়ে যোগ দেয়, তাহলে আমার পরিবারের
বাইরের লোকে আমার এই রাজত্ব দখল করার চেষ্টা করবে। কাজেই বয়স অল্প থাকতেই
তাকে নিয়ে যাও। তার মনে দুনিয়ার ভালোবাসা, সুখ, আহ্লাদ সৃষ্টি করার
চেষ্টা করো। এতে করে সে হয়তো আমার মৃত্যুর পর তোমাদের রাজা হতে চাইবে।”
রাজার উপদেষ্টামণ্ডলী সঙ্গে সঙ্গে পরিকল্পনা করলেন কী করা যায়। পরিকল্পনা
অনুযায়ী তারা বিশাল একটি এলাকা খুঁজে বের করলেন এবং তার পুরোটাই প্রাচীর
দিয়ে ঘিরে দেয়া হলো। অতঃপর সেই শিশু রাজকুমারকে তারা প্রাচীর ঘেরা
এলাকায় রেখে তার সবরকম বিনোদন আর বিলাসিতার ব্যবস্থা করলেন। রাজকুমার
সাবালক না হওয়া পর্যন্ত চার দেয়ালের ভিতরেই জীবন কাটাতে লাগল। একদিন সে
চারিদিকে একনজর তাকিয়ে বলল: “আমার ধারণা এই চার দেয়ালের বাইরেও একটি
পৃথিবী আছে। আমাকে বাইরে নিয়ে চলো। আমি জ্ঞান অর্জন করতে চাই।”
তত্ত্বাবধায়কেরা
বলল, “বাইরের জগতের সাথে এখানকার কোন পার্থক্য নেই।” রাজকুমার তর্ক না করে
আরেক বছর পার করলো। এতোদিন সে চার দেয়ালের ভিতরেই ঘোড়ায় চড়ে সময়
কাটিয়েছে। একবছর পরে স্বাভাবিকভাবেই সে আবার তার তত্ত্বাবধায়কদের একই
অনুরোধ করল। আর তারাও গত বছরের ন্যয় একই উত্তর দিলো।
কিন্তু এবার
রাজকুমার জোরালো কণ্ঠে বলল : “আমাকে যেতেই হবে।” তত্ত্বাবধায়কেরা তাকে
থামিয়ে রাখতেও পারে না আবার ছেড়ে দিতেও পারে না। ফলে বিষয়টি তাড়াতাড়ি
করে রাজাকে জানানো হলো। রাজা ছেলেকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে বললেন,
“আমরা তা-ই চাই যা আমাদের ভালো লাগে। কিন্তু আল্লাহ্ তা-ই ঘটান যা তিনি
ইচ্ছা করেন।”
এবার লোকেরা রাজকুমারের নিকট ফিরে আসলো এবং তার জন্য নির্মিত সেই প্রাচীর বেষ্টিত অভয়ারণ্যের দরজা খুলে দিলো। রাজকুমার জীবনে প্রথমবার বাইরের জগতে পা
রেখে অবাক বিস্ময়ে চারপাশে তাকাতে থাকলো। তাকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি
দেয়া হলেও তার দেখাশোনা করার জন্য সাথে ছিল তত্ত্বাবধায়ক বাহিনী। শিশুকাল
থেকে চার দেয়ালের ভিতর বিলাসীতায় জীবন কেটেছে তার। এখন বাইরের পৃথিবী
সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই। কাজেই রাজার উপদেষ্টারা রাজকুমারের সাথে
নিরাপত্তা রক্ষীদের থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করলেন। সাথের লোকজনের সকলেই
তার নতুন পৃথিবী দেখার প্রতিক্রিয়াকে খেয়াল করতে থাকলো। লোকেরা তখনও
আশাবাদী এই রাজকুমারই একদিন তাদের রাজা হবেন।
কিছুদূর হাটার পর তারা ভীষণ রোগাক্রান্ত এক ব্যক্তিকে দেখতে পেল। রাজপুত্র জিজ্ঞেস করল, “কি হয়েছে তার?”
উপদেষ্টারা জবাবে বলল : “সে ভীষণ অসুস্থ।”
দুনিয়াদারীর জ্ঞানশুন্য, অনভিজ্ঞ রাজপুত্র জানতে চাইলো, “এই লোকের রোগ কি সব মানুষেরই হয় নাকি হাতে গোনা কিছুলোক রোগাক্রান্ত হয়?”
লোকেরা জবাব দিলো, “আল্লাহ্ যার ভাগ্যে লিখে রেখেছেন তারই রোগ হয়।”
রাজপুত্র জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা! ঐসব লোকেরা তাহলে আগে থেকেই জানতে পারে এবং রোগাক্রান্ত হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়, তা-ই না? নাকি এ ব্যাপারে কোনো সতর্কবাণী আসে না। ফলে সবাই রোগাক্রান্ত হওয়ার ভয়ে আতঙ্কিত থাকে?”
তারা বলল, “আসলে সবাই রোগাক্রান্ত হওয়ার ভয়ে আতঙ্কিত থাকে।”
“এতো ক্ষমতাধর রাজকুমার হওয়ার পরও আমিও কি অন্যসব মানুষের মতোই?”
তারা বলল, “জী, তা সত্ত্বেও আপনিও তাদের মতোই।”
রাজপুত্র বলল, “তাহলে তো তোমাদের এই জীবনও নিরাপত্তাহীন এবং ঝুঁকিপূর্ণ!”
তারা হাঁটতে থাকলো। কিছুদূর যেতেই এক জরাগ্রস্ত দুর্বল বৃদ্ধের দেখা মিললো। শক্তিহীন সেই বৃদ্ধ বয়সের ভারে নুইয়ে পড়েছে। মুখের লালা ঝরে বুকে গড়িয়ে পড়ছে। এতো বৃদ্ধ মানুষ রাজপুত্র এর আগে আর কখনো দেখেনি। অবাক বিস্ময়ে সে জিজ্ঞেস করল, “তার কেন এই অবস্থা?”
তারা বলল, “বার্ধক্যের কারণে মানুষ এমন হয়ে যায়।”
রাজপুত্র জিজ্ঞেস করল, “সব মানুষেরই কি এমন অবস্থা হয় নাকি অল্পকিছু মানুষের এমন হয়ে থাকে?”
তারা বলল, “আসলে সব মানুষই এই পরিণতির ভয়ে আতঙ্কিত থাকে।”
রাজপুত্র বলল, “তাহলে তোমাদের জীবন তো নিরাপত্তাহীন এবং ঝুঁকিপূর্ণ।”
তারা আবার হাটা শুরু করল। কিছু দূর যেতেই দেখল বেশকিছু লোক একটি লাশ বহন করে নিয়ে যাচ্ছে। মৃত্যু সম্পর্কে রাজপুত্রের কোনো জ্ঞান না থাকায় সে অবাক বিস্ময়ে জানতে চাইলো, “কি হয়েছে তার?”
জবাবে তারা বলল, “লোকটি মারা গেছে।”
রাজপুত্র বলল, “তাকে উঠে বসতে বলো, কথা বলতে বলো।”
তারা বলল, “তার জন্য উঠে বসা বা কথা বলা আর সম্ভব নয়।”
রাজপুত্র জিজ্ঞেস করল, “সব মানুষই কি মারা যায় নাকি অল্পকিছু লোক এভাবে মারা যায়?”
তারা বলল, “কেউ ভয় করুক আর না করুক, প্রত্যেকেরই শেষ পরিনতি মৃত্যু।”
রাজপুত্র বলল, “তোমরা কি তাহলে এ সবকিছুই এতোদিন যাবৎ আমার কাছে লুকাচ্ছিলে?”
“কেউ যত ক্ষমতাধরই হোক না কেন, এই শেষ পরিণতি থেকে রক্ষা পাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।”
মর্মাহত রাজপুত্র বলল, “তোমরা এতোদিন আমার সাথে প্রতারণা করেছ। আজ যদি আমি সেই চার দেয়ালের বাইরে না আসতাম তাহলে হঠাৎ কবে মারা যেতাম। অথচ বুঝতেও পারতাম না যে, আমি মারা যাচ্ছি। আজ আমি তোমাদের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত।”
সে তাদের সঙ্গ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু ব্যর্থ হলো। সাথের লোকেরা সংখ্যায় অধিক হওয়ায় সবাই তাকে ঘিরে ধরলো।
তারা বলল, “আপনার পিতার নিকট ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত আমরা আপনার সাথেই থাকছি। অবশেষে, সবাই প্রাসাদে ফিরে আসলো এবং লোকেরা রাজার কাছে সবকিছু খুলে বলল।”
নিরাশ হয়ে রাজা বললেন, “আমি কি তোমাদের বলিনি, আমরা তা-ই চাই যা আমরা পছন্দ করি কিন্তু আল্লাহ্ তা-ই ঘটান যা তিনি ইচ্ছা করেন। তাকে যেতে দাও। আজ থেকে তার ওপর তোমাদের আর কোন নিয়ন্ত্রন নেই।”
_________________
বিষয়ঃ ইসলামী পোস্টPosted by Mohammad Gaffer
SHARE ON FACEBOOK
আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুণ। এই ব্লগে পড়তে কি সমস্যা হয়?আপনার কি টাকা বেশি খরচ হয়ে যায়?
স্থায়ী দাম্পত্যের জন্য বিবাহপূর্ব পরামর্শ গ্রহণ করুন
প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না
শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু
সম্প্রতি এক বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেখানে মানুষের দাম্পত্য
নিয়ে নানা সমস্যার কথা শুনলাম। অতিথিরা যখন নেচে গেয়ে অনুষ্ঠান মাত
করছিল, হলের একদম পেছনের দিকে বসে বসে ভেঙ্গে যাওয়া স্বপ্ন আর অপূর্ণ
প্রত্যাশা নিয়ে আমাদের কথা হচ্ছিল। গানবাজনার উচ্চ শব্দের কারণে পরস্পরের
কথা শোনার জন্য মাঝে মাঝে আমাদেরকে চিৎকার করে কথা বলতে হচ্ছিল। একজন
কমবয়সী নারী বললেন, তার স্বামী তাকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে দেবেন না।
উপস্থিত আরেক বান্ধবী শশুরবাড়ির লোকজনের সাথে কীভাবে চলতে হবে সেই বিষয়ে
পরামর্শ চাইলেন। এক মা কাঁদতে কাঁদতে তার মেয়ের সম্ভব্য বিবাহ বিচ্ছেদের
কথা বললেন। তালাকপ্রাপ্তা মেয়ে কীভাবে ঘরে তুলতে কেমন লাগবে সেই অনুভূতির
কথাও বললেন।
অন্যরকম একটা রাত! নবদম্পতির জন্য অনেক অনেক দো‘আ আর শুভকামনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের ইতি হলো। মনে আছে, বর-কনে, উভয়ের জন্য আমি আরও বেশি দো‘আ করেছিলাম : ‘হে আল্লাহ! ওদের তুমি একটা স্থায়ী এবং সুস্থ-সুন্দর সম্পর্ক দিয়ে ধন্য করো। আমীন।’ অনুষ্ঠান থেকে গভীর চিন্তা নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। ফলে ঘুমিয়ে পড়তে বেশ সমস্যা হলো। ওইরাতে অভিজ্ঞতার পরিহাস আমাকে ভালো মতোই নাড়া দিল।
গত কয়েকমাসের মধ্যেই আমার আশেপাশের অনেক কয়টা সংসার ভেঙ্গে গেছে। আমার জানা মতে, এমন আরও অনেক দম্পতি চূড়ান্ত বিচ্ছদের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, বিবাহ বিচ্ছেদ একটি সঠিক এবং অনেক ক্ষেত্রে একটা অপরিহার্য পছন্দ। কিন্তু কী কারনে এত বিপুল সংখ্যক দাম্পত্য জীবনের এত দ্রুত অবসান ঘটছে? প্রতিশ্রুতি এবং দায়িত্ববোধের একটি সংস্কৃতিকে লালন করার জন্য কী ধরণের পরিবর্তন দরকার?
সেদিন রাতে যতগুলো ঘটনা আমি শুনেছিলাম, তার সবগুলোর সারকথা ছিল একটাই : বিয়ের আগে ওইসব দম্পতির কেউই বিবাহপূর্ব পরামর্শ গ্রহণ করেননি। তাদের কেউই বিয়ের মতো জীবন সংগ্রামের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেনি এবং তাদের অধিকাংশ সমস্যাগুলো এমন সব বিষয় থেকে সৃষ্টি হয়েছিল, বিয়ের পূর্বে যেগুলো নিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি। মুসলিম সমাজগুলোতে বিবাহ বিচ্ছেদের উপর একটি সাম্প্রতিক গবেষনায় দেখা গেছে, গবেষণায় অংশ নেওয়া তালাকপ্রাপ্ত নারী-পুরুষদের কেউই মসজিদের ইমামের সাথে সংক্ষিপ্ত আলোচনা ছাড়া, অন্যকোনো বিবাহপূর্ব পরামর্শই গ্রহন করেননি। তাদের অনেকেই বলেছেন, আরও ব্যাপক বিবাহপূর্ব পরামর্শ পেলে এবং বিয়ের পরে সমস্যায় পড়ার সাথে সাথে এধরনের সহজ পরামর্শ পেলে তারা অনেক উপকৃত হতেন। আমাদের সমাজগুলোতে বিয়ের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের অভাব একটি দুঃখজনক বাস্তবতা।
যখনই কোনো দম্পতির বাগদানের খবর শুনি, আমরা অনুষ্ঠান উদ্যাপনের জন্য দৌড়ে যায়। কখনও কি আমরা সময় করে ভেবেছি, সারাজীবনের জন্য একটি সিদ্ধান্ত নিতে ওই নবদম্পতির কী পরিমাণ প্রস্তুতি এবং সহযোগিতার প্রয়োজন? বিয়ের অনুষ্ঠানে হাসিখুশি চেহারায় ছবি তুলতে ব্যস্ত কয়জন নবদম্পতি আসলেই জানে, তারা কোন পথে পা বাড়াচ্ছে? নতুন সম্পর্কের প্রেমোত্তেজনা তাদেরকে প্রায়ই এই বাস্তবতা উপলব্ধিতে অন্ধ করে দেয় যে, তাদের বিয়ে হলো স্রষ্টার সাথে একটি পবিত্র অঙ্গীকার। এই আত্মিক সম্পর্কের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা কি তাৎপর্যপূর্ণ নয়?
বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য আমরা কত সময়, শ্রম আর অর্থ ব্যয় করি! অথচ খোদ বিয়ের জন্যই কিছু করি না। এমন কেন হয়? বিয়ে অনুষ্ঠানের সামান্য বিষয়টা নিয়েও আমাদের জল্পনা-কল্পনার কমতি থাকে না। অথচ সেই অনুষ্ঠান উদ্যাপনের অপরিহার্য উদ্দেশ্য, অন্য একজন মানুষের সাথে সারাটা জীবন কাটিয়ে দেওয়ার “অঙ্গীকার”কে আমরা উপেক্ষা করে যায়। একজন মহিলা আমাকে বলেছিলেন, ‘বিয়ে নিয়ে ভাবার জন্য দু’মাস মাত্র সময় পেয়েছিলাম। প্রেমে মগ্ন হয়ে গিয়েছিলাম, তাই অন্যকিছু নিয়ে ভাববার সময় পায়নি।’
অনেক যুগল ভূলবশত মনে করেন, বিয়ের আগে তাদের কোন পরামর্শ গ্রহনের প্রয়োজন নেই, দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলতে পারলেই সব ঠিক থাকবে। তবে কথা হলো, একটা নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত দ্বন্দ্ব থাকা সুস্থ দাম্পত্যের জন্য জরুরি এবং বিবাহপূর্ব পরামর্শ সম্ভব্য সমস্যা সৃষ্টিকারী বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ করে দেয়।
বিয়ের ব্যাপারে পাকাকথা দেওয়ার আগেই বিবাহপূর্ব পরামর্শ গ্রহণ করুন।
পরিবার ও বিবাহ বিষয়ক গবেষক, লিসা কিফ্ট এর মতে, বিবাহপূর্ব পরামর্শ গ্রহণ আপনাকে নিন্মোক্ত ক্ষেত্রে সাহায্য করবে:
১) পারস্পরিক ভূমিকার ব্যাপারে প্রত্যাশাগুলো কেমন, তা আলোচনা করা। একটি দাম্পত্য সম্পর্কে প্রত্যেকের নিজনিজ দায়িত্ব এবং কর্তব্যগুলো নিয়ে কথা বলা জরুরি। যেমন : কে আর্থিক দিকটা সামলাবেন আবার কে বাড়ির কাজগুলো দেখাশোনা করবেন ইত্যাদি। আগেভাগেই প্রত্যেকের দায়দায়িত্ব সম্পর্কে আলোচনা হলে, পরস্পরের কাছে ভবিষ্যত প্রত্যাশাগুলো সচ্ছ এবং পরিষ্কার হয়ে যায়।
২) পরস্পরের ব্যক্তিগত এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া। গানবাজনা, হিজাব, জবাই করা পশুর গোশত খাওয়া, কোনো নির্দিষ্ট মাযহাবের অনুসরণ করা ইত্যাদি বিষয়ে দুজনের কার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন, তা জেনে নিন। সময় থাকতেই এসব বিষয়ে আলোচনা করলে আপনারা পরস্পরের জন্য কতটুকু মানানসই, তা বুঝতে পারবেন। এতে করে কীভাবে ভিন্ন মতের মানুষের সাথে মানিয়ে চলতে হবে তা জানা যাবে।
৩) পরস্পরের বংশ এবং পরিবার সম্পর্কে কথা বলা। একটি সম্পর্কের সাথে যতগুলো বিষয় জড়িত থাকে, তার অধিকাংশ সম্পর্কে আমরা আমাদের বাবা-মা এবং পরিবারের সদস্যদের থেকে শিখে থাকি। জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ের প্রভাবগুলো চিহ্নিত করলে এবং সেসব থেকে অর্জিত আচার-ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করলে বুঝা যায়, দাম্পত্য জীবনে সেগুলো কোন ধরণের ভূমিকা রাখতে পারে।
৪) পারস্পরিক যোগাযোগ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ান। যে দম্পতির মাঝে যত উন্নতমানের বোঝাপড়া বিদ্যমান, তারা তত কার্যকরভাবে নিজেদের সমস্যার নিরসন করতে পারেন। এতে করে খুব সামান্য সময়ই আপনি তর্কে জড়াবেন এবং অধিকাংশ সময় পরস্পরকে বুঝতে পারবেন।
৫) ব্যাক্তি জীনবের জন্য, দাম্পত্য জীবনের জন্য এবং পারিবারিক জীবনের জন্য লক্ষ্য স্থির করুন। মনে রাখবেন, আপনি অন্য একটা মানুষের সাথে নিজের জীবনটাকে ভাগাভাগি করার অঙ্গীকার করতে যাচ্ছেন। একসাথে থাকা অবস্থায় নিজেদের ভবিষ্যতটা কেমন দেখতে চান, তা আলোচনা করা কি জরুরি নয়? বিয়ে পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে নিজেকে কোথায় দেখতে চান? কয়টি সন্তান প্রত্যাশা করেন? ভবিষ্যত জীবনের একটা রূপরেখা তৈরি করা পরস্পরকে বুঝার একটা অসাধারণ উপায়। এতে পারস্পরিক অঙ্গীকারগুলো আরও দৃঢ় হয়ে যায়।
বিবাহপূর্ব পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে দম্পতিরা অনেক মানসিক যন্ত্রণা এবং দ্বন্দ্ব সংঘাত থেকে মুক্তি পেতে পারেন। সমস্যার সমাধান খোঁজার চেয়ে সমস্যা যেন তৈরিই না হয়, তা নিশ্চিত করা ইসলামের অন্যতম মূল বিষয়। কাজেই আমাদের ইমামগণ এবং সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের বিবাহপূর্ব পরামর্শ এবং শিক্ষা দানের জন্য প্রশিক্ষন গ্রহণ করা দরকার। এটি হবে সুখী দম্পতি এবং সুস্থ দাম্পত্যের ক্ষেত্রে একটি নিশ্চিত লাভজনক বিনিয়োগ।
২) বিবাহপূর্ব পরামর্শ দানের ক্ষেত্রে আর কী কী বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত বলে আপনার মনে হয়?
৩) কীভাবে সম্ভব্য পাত্র-পাত্রীদেরকে বিবাহপূর্ব পরামর্শ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা যায়?
![mmwebbanner_pure-matermony]()
শুধুমাত্র বাস্তব জীবনে ইসলাম চর্চাকারী অবিবাহিত মুসলিম ছেলেমেয়েদেরকে আল্লাহ্ভীরু জীবন সঙ্গী/সঙ্গিনী খুঁজে পেতে সহায়তা করাই “পিওর ম্যাট্রিমনি” ওয়েবসাইটের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য। বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন - http://www.quraneralo.com/purematrimony/
Facebook: http://www.facebook.com/purematrimonybd
আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুণ। এই ব্লগে পড়তে কি সমস্যা হয়?আপনার কি টাকা বেশি খরচ হয়ে যায়?
মূল : আমাল কিল্লাওয়ি | ভাষান্তর ও সম্পাদনা : আব্দ আল-আহাদ
প্রকাশনায় : PureMatrimony Bangladesh

অন্যরকম একটা রাত! নবদম্পতির জন্য অনেক অনেক দো‘আ আর শুভকামনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের ইতি হলো। মনে আছে, বর-কনে, উভয়ের জন্য আমি আরও বেশি দো‘আ করেছিলাম : ‘হে আল্লাহ! ওদের তুমি একটা স্থায়ী এবং সুস্থ-সুন্দর সম্পর্ক দিয়ে ধন্য করো। আমীন।’ অনুষ্ঠান থেকে গভীর চিন্তা নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। ফলে ঘুমিয়ে পড়তে বেশ সমস্যা হলো। ওইরাতে অভিজ্ঞতার পরিহাস আমাকে ভালো মতোই নাড়া দিল।
গত কয়েকমাসের মধ্যেই আমার আশেপাশের অনেক কয়টা সংসার ভেঙ্গে গেছে। আমার জানা মতে, এমন আরও অনেক দম্পতি চূড়ান্ত বিচ্ছদের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, বিবাহ বিচ্ছেদ একটি সঠিক এবং অনেক ক্ষেত্রে একটা অপরিহার্য পছন্দ। কিন্তু কী কারনে এত বিপুল সংখ্যক দাম্পত্য জীবনের এত দ্রুত অবসান ঘটছে? প্রতিশ্রুতি এবং দায়িত্ববোধের একটি সংস্কৃতিকে লালন করার জন্য কী ধরণের পরিবর্তন দরকার?
সেদিন রাতে যতগুলো ঘটনা আমি শুনেছিলাম, তার সবগুলোর সারকথা ছিল একটাই : বিয়ের আগে ওইসব দম্পতির কেউই বিবাহপূর্ব পরামর্শ গ্রহণ করেননি। তাদের কেউই বিয়ের মতো জীবন সংগ্রামের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেনি এবং তাদের অধিকাংশ সমস্যাগুলো এমন সব বিষয় থেকে সৃষ্টি হয়েছিল, বিয়ের পূর্বে যেগুলো নিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি। মুসলিম সমাজগুলোতে বিবাহ বিচ্ছেদের উপর একটি সাম্প্রতিক গবেষনায় দেখা গেছে, গবেষণায় অংশ নেওয়া তালাকপ্রাপ্ত নারী-পুরুষদের কেউই মসজিদের ইমামের সাথে সংক্ষিপ্ত আলোচনা ছাড়া, অন্যকোনো বিবাহপূর্ব পরামর্শই গ্রহন করেননি। তাদের অনেকেই বলেছেন, আরও ব্যাপক বিবাহপূর্ব পরামর্শ পেলে এবং বিয়ের পরে সমস্যায় পড়ার সাথে সাথে এধরনের সহজ পরামর্শ পেলে তারা অনেক উপকৃত হতেন। আমাদের সমাজগুলোতে বিয়ের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের অভাব একটি দুঃখজনক বাস্তবতা।
যখনই কোনো দম্পতির বাগদানের খবর শুনি, আমরা অনুষ্ঠান উদ্যাপনের জন্য দৌড়ে যায়। কখনও কি আমরা সময় করে ভেবেছি, সারাজীবনের জন্য একটি সিদ্ধান্ত নিতে ওই নবদম্পতির কী পরিমাণ প্রস্তুতি এবং সহযোগিতার প্রয়োজন? বিয়ের অনুষ্ঠানে হাসিখুশি চেহারায় ছবি তুলতে ব্যস্ত কয়জন নবদম্পতি আসলেই জানে, তারা কোন পথে পা বাড়াচ্ছে? নতুন সম্পর্কের প্রেমোত্তেজনা তাদেরকে প্রায়ই এই বাস্তবতা উপলব্ধিতে অন্ধ করে দেয় যে, তাদের বিয়ে হলো স্রষ্টার সাথে একটি পবিত্র অঙ্গীকার। এই আত্মিক সম্পর্কের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা কি তাৎপর্যপূর্ণ নয়?
বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য আমরা কত সময়, শ্রম আর অর্থ ব্যয় করি! অথচ খোদ বিয়ের জন্যই কিছু করি না। এমন কেন হয়? বিয়ে অনুষ্ঠানের সামান্য বিষয়টা নিয়েও আমাদের জল্পনা-কল্পনার কমতি থাকে না। অথচ সেই অনুষ্ঠান উদ্যাপনের অপরিহার্য উদ্দেশ্য, অন্য একজন মানুষের সাথে সারাটা জীবন কাটিয়ে দেওয়ার “অঙ্গীকার”কে আমরা উপেক্ষা করে যায়। একজন মহিলা আমাকে বলেছিলেন, ‘বিয়ে নিয়ে ভাবার জন্য দু’মাস মাত্র সময় পেয়েছিলাম। প্রেমে মগ্ন হয়ে গিয়েছিলাম, তাই অন্যকিছু নিয়ে ভাববার সময় পায়নি।’
অনেক যুগল ভূলবশত মনে করেন, বিয়ের আগে তাদের কোন পরামর্শ গ্রহনের প্রয়োজন নেই, দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলতে পারলেই সব ঠিক থাকবে। তবে কথা হলো, একটা নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত দ্বন্দ্ব থাকা সুস্থ দাম্পত্যের জন্য জরুরি এবং বিবাহপূর্ব পরামর্শ সম্ভব্য সমস্যা সৃষ্টিকারী বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ করে দেয়।
বিয়ের ব্যাপারে পাকাকথা দেওয়ার আগেই বিবাহপূর্ব পরামর্শ গ্রহণ করুন।
পরিবার ও বিবাহ বিষয়ক গবেষক, লিসা কিফ্ট এর মতে, বিবাহপূর্ব পরামর্শ গ্রহণ আপনাকে নিন্মোক্ত ক্ষেত্রে সাহায্য করবে:
১) পারস্পরিক ভূমিকার ব্যাপারে প্রত্যাশাগুলো কেমন, তা আলোচনা করা। একটি দাম্পত্য সম্পর্কে প্রত্যেকের নিজনিজ দায়িত্ব এবং কর্তব্যগুলো নিয়ে কথা বলা জরুরি। যেমন : কে আর্থিক দিকটা সামলাবেন আবার কে বাড়ির কাজগুলো দেখাশোনা করবেন ইত্যাদি। আগেভাগেই প্রত্যেকের দায়দায়িত্ব সম্পর্কে আলোচনা হলে, পরস্পরের কাছে ভবিষ্যত প্রত্যাশাগুলো সচ্ছ এবং পরিষ্কার হয়ে যায়।
২) পরস্পরের ব্যক্তিগত এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া। গানবাজনা, হিজাব, জবাই করা পশুর গোশত খাওয়া, কোনো নির্দিষ্ট মাযহাবের অনুসরণ করা ইত্যাদি বিষয়ে দুজনের কার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন, তা জেনে নিন। সময় থাকতেই এসব বিষয়ে আলোচনা করলে আপনারা পরস্পরের জন্য কতটুকু মানানসই, তা বুঝতে পারবেন। এতে করে কীভাবে ভিন্ন মতের মানুষের সাথে মানিয়ে চলতে হবে তা জানা যাবে।
৩) পরস্পরের বংশ এবং পরিবার সম্পর্কে কথা বলা। একটি সম্পর্কের সাথে যতগুলো বিষয় জড়িত থাকে, তার অধিকাংশ সম্পর্কে আমরা আমাদের বাবা-মা এবং পরিবারের সদস্যদের থেকে শিখে থাকি। জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ের প্রভাবগুলো চিহ্নিত করলে এবং সেসব থেকে অর্জিত আচার-ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করলে বুঝা যায়, দাম্পত্য জীবনে সেগুলো কোন ধরণের ভূমিকা রাখতে পারে।
৪) পারস্পরিক যোগাযোগ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ান। যে দম্পতির মাঝে যত উন্নতমানের বোঝাপড়া বিদ্যমান, তারা তত কার্যকরভাবে নিজেদের সমস্যার নিরসন করতে পারেন। এতে করে খুব সামান্য সময়ই আপনি তর্কে জড়াবেন এবং অধিকাংশ সময় পরস্পরকে বুঝতে পারবেন।
৫) ব্যাক্তি জীনবের জন্য, দাম্পত্য জীবনের জন্য এবং পারিবারিক জীবনের জন্য লক্ষ্য স্থির করুন। মনে রাখবেন, আপনি অন্য একটা মানুষের সাথে নিজের জীবনটাকে ভাগাভাগি করার অঙ্গীকার করতে যাচ্ছেন। একসাথে থাকা অবস্থায় নিজেদের ভবিষ্যতটা কেমন দেখতে চান, তা আলোচনা করা কি জরুরি নয়? বিয়ে পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে নিজেকে কোথায় দেখতে চান? কয়টি সন্তান প্রত্যাশা করেন? ভবিষ্যত জীবনের একটা রূপরেখা তৈরি করা পরস্পরকে বুঝার একটা অসাধারণ উপায়। এতে পারস্পরিক অঙ্গীকারগুলো আরও দৃঢ় হয়ে যায়।
বিবাহপূর্ব পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে দম্পতিরা অনেক মানসিক যন্ত্রণা এবং দ্বন্দ্ব সংঘাত থেকে মুক্তি পেতে পারেন। সমস্যার সমাধান খোঁজার চেয়ে সমস্যা যেন তৈরিই না হয়, তা নিশ্চিত করা ইসলামের অন্যতম মূল বিষয়। কাজেই আমাদের ইমামগণ এবং সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের বিবাহপূর্ব পরামর্শ এবং শিক্ষা দানের জন্য প্রশিক্ষন গ্রহণ করা দরকার। এটি হবে সুখী দম্পতি এবং সুস্থ দাম্পত্যের ক্ষেত্রে একটি নিশ্চিত লাভজনক বিনিয়োগ।
আপনার অভিমত জানান :
১) আপনি কি সম্ভব্য পাত্র-পাত্রীদের জন্য বিবাহপূর্ব পরামর্শ গ্রহণ করাকে উপকারী বলে মনে করেন?২) বিবাহপূর্ব পরামর্শ দানের ক্ষেত্রে আর কী কী বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত বলে আপনার মনে হয়?
৩) কীভাবে সম্ভব্য পাত্র-পাত্রীদেরকে বিবাহপূর্ব পরামর্শ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা যায়?
আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত জানিয়ে মন্তব্য করুন।
Join Pure Matrimony!

শুধুমাত্র বাস্তব জীবনে ইসলাম চর্চাকারী অবিবাহিত মুসলিম ছেলেমেয়েদেরকে আল্লাহ্ভীরু জীবন সঙ্গী/সঙ্গিনী খুঁজে পেতে সহায়তা করাই “পিওর ম্যাট্রিমনি” ওয়েবসাইটের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য। বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন - http://www.quraneralo.com/purematrimony/
Facebook: http://www.facebook.com/purematrimonybd
আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুণ। এই ব্লগে পড়তে কি সমস্যা হয়?আপনার কি টাকা বেশি খরচ হয়ে যায়?
মানুষ কষ্ট দিলে মনের ক্ষত সারাবেন যেভাবে
পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না
শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু

বিষয়ঃ ইসলাম
share on facebook
আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুণ। এই ব্লগে পড়তে কি সমস্যা হয়?আপনার কি টাকা বেশি খরচ হয়ে যায়?

মূল প্রবন্ধ : ইয়াসমিন মোজাহেদ | ভাষান্তর : মোঃ মুনিমুল হক | সম্পাদনা : আব্দ আল-আহাদ
যখন ছোট ছিলাম, পৃথিবীটাকে মনে হতো
একেবারেই নির্ঝঞ্ঝাট এবং খুব পরিপাটি একটা জায়গা। কিন্তু বড় হয়ে দেখলাম
ব্যাপারটা মোটেও সেরকম নয়। ভাবতাম সবকিছুই ন্যায়নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত।
অর্থাৎ আমার মনে হতো, কারও প্রতি কখনো কোনোরূপ অন্যায় করা যাবে না। কোনো
অন্যায় যদি হয়েই যায়, তাহলে সকল ক্ষেত্রেই সুবিচারের জয় হবে। নিজের এই
নীতিবোধ অনুযায়ী, সবকিছু যেমনটি হওয়া উচিত তেমনটি ঠিক রাখার জন্য অনেক
সংগ্রাম করেছি জীবনে। কিন্তু এই সংগ্রাম করতে গিয়ে জীবনের একটি মৌলিক
সত্যকে উপেক্ষা করছিলাম আমি। আমার শিশুসুলভ আদর্শবাদের কারণে আমি বুঝতেই
পারিনি, সৃষ্টিগতভাবেই এই পার্থিব জগতটা ত্রুটিযুক্ত। ঠিক যেভাবে আমরা
মানুষরা সৃষ্টিগতভাবে অপূর্ণ, ত্রুটিযুক্ত। সবসময় অঘটন আর ঝামেলা লেগেই
থাকে আমাদের জীবনে। এসব ঝামেলাই জড়িয়ে, জেনেই হোক, না-জেনেই হোক, ইচ্ছা
কি অনিচ্ছায় হোক, অনিবার্যভাবেই আমরা মানুষের মনে কষ্ট দিয়ে ফেলি। বাস্তব
হলো, পৃথিবীটা সবসময় ন্যায়নীতি দিয়ে চলে না।
তার মানে কি এই যে, আমরা অবিচারের
বিরুদ্ধে লড়াই থামিয়ে দেবো, সত্যের পক্ষে হাল ছেড়ে দেবো? অবশ্যই না। এর
মানে হলো, আমরা অবশ্যই এই পৃথিবী এবং আর সবকিছুকে কোনো কাল্পনিক বা অবাস্তব
মানদণ্ডে বিচার করতে যাবো না। তবে এমনটি না-করাও সহজ না। কীভাবে আমরা এতো
ত্রুটিময় এই পৃথিবীতে টিকে থাকবো, যেখানে মানুষ প্রতিনিয়ত পরস্পরকে
হতাশায় ডুবাচ্ছে, এমনকি নিজ পরিবারের লোকেরাই মনে আঘাত দিয়ে মনটা ভেঙ্গে
দিচ্ছে? সবচেয়ে কঠিন বিষয়টি হলো, আমাদের প্রতি কেউ অন্যায় করলে কীভাবে
আমরা সেই অপরাধকে ক্ষমা
করতে শিখব? কীভাবে আমরা নিষ্ঠুর না হয়েও দৃঢ় হতে পারি? অথবা কীভাবে
দুর্বল না হয়েও মনের কোমলতাকে বজায় রাখতে পারি? কখন আমরা কোনো কিছুকে
আঁকড়ে ধরে রাখবো? আর কখন সেটিকে বন্ধন থেকে মুক্ত করে দেবো? কখন বেশি বেশি
যত্ন দেখালে তা বাড়াবাড়ি হয়ে যায়? কারও প্রতি মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসা
বলে কি কোনো জিনিস আছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদেরকে
প্রথমে নিজেরদের জীবনের গণ্ডি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আমাদের খুঁজে দেখতে
হবে, আমরাই প্রথম বা শেষ কিনা, যারা কষ্ট এবং অন্যায়ের শিকার। যে
মানুষগুলো আমাদের আগে পৃথিবীতে ছিল তাদের জীবনের দিকে দৃষ্টিপাত করতে হবে।
তাদের সংগ্রাম এবং তাদের বিজয় নিয়ে আমাদের চিন্তাভাবনা করতে হবে। আমাদের
বুঝতে হবে, কষ্ট ছাড়া কখনোই কোনো অগ্রগতি আসেনি এবং সাফল্যের একমাত্র পথ
হলো সংগ্রাম। উপলব্ধি করতে হবে, জীবন সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো কষ্টভোগ
করা এবং অন্যদের দেওয়া দুঃখকষ্ট এবং ক্ষতিকে জয় করা।
আমাদের নবীদের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তসমূহ
স্মরণ করলে আমরা দেখতে পাই যে, দুঃখকষ্ট ভোগ করা শুধু আমাদের জন্য কোনো
বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মনে রাখবেন, নূহ (আ) তাঁর জাতির লোকদের দ্বারা ৯৫০ বছর
ধরে অত্যাচারীত হয়েছিলেন। কুরআন আমাদের বলে :
“তাদের
পূর্বে নূহের সম্প্রদায়ও অস্বীকার করেছিল। তারা আমার বান্দাকে অস্বীকার
করেছিল এবং এবং বলেছিল, ‘পাগল।’ আর তাকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল।”
[সূরা আল-কামার; ৫৪ : ৯]
[সূরা আল-কামার; ৫৪ : ৯]
নূহের (আ) উপর এত বেশী অত্যাচার করা হয়েছিল যে:
“তিনি তার পালনকর্তাকে ডেকে বললেনঃ আমি পরাভূত, অতএব, তুমি সাহায্য করো।” [আল-কামার; ৫৪ : ১০]
নবীর (সা) কথাই মনে করে দেখুন, কীভাবে
তাঁকে পাথর মেরে রক্তাক্ত করা হয়েছিল। কীভাবে তাঁর সাহাবীদের প্রহার করা
হয়েছিল। কীভাবে তারা অনাহারে দিন পার করেছিলেন। অন্য মানুষরাই তাদেরকে
এভাবে কষ্ট দিয়েছিল। এমনকি আমরা অস্তিত্বে আসার পূর্বেই ফেরেশতারা মানুষের
এই ধরণের চারিত্রিক দিকটি বুঝতে পেরেছিল। আল্লাহ্ যখন বললেন যে, তিনি
মানুষ সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন, তখন ফেরেশতারা প্রথম যে প্রশ্নটি করেছিল তা ছিল
মানুষের ক্ষতিকর সম্ভাবনা সম্পর্কে। আল্লাহ্ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন :
“আর স্মরণ
করুন, যখন আপনার রব ফেরেশতাদের বললেন : ‘নিশ্চয়ই আমি যমিনে একজন খলিফা
সৃষ্টি করছি’, তারা বলল, আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যে তাতে
ফাসাদ করবে এবং রক্ত প্রবাহিত করবে? আর আমরা তো আপনার প্রশংসায় তাসবীহ্
পাঠ করছি এবং আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি। তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই আমি জানি
যা তোমরা জানো না।’ ” [আল-বাকারাহ্; ২ : ৩০]
মানুষ
জাতির একে অপরের বিরুদ্ধে ঘৃণিত অপরাধ সংঘটনের এই প্রবণতা একটি দুঃখজনক
বাস্তবতা। তবে আমাদের অনেকেই অনেক সৌভাগ্যবান। আমাদের অধিকাংশকেই কখনো এমন
কোনো দুঃখকষ্টের শিকার হতে হয়নি অন্যরা প্রতিনিয়তই যার শিকার হচ্ছে।
আমাদেরকে অনেককেই কোনোদিন নিজের চোখে দেখতে হবে না যে, আমাদের পরিবার
পরিজনের কাউকে নির্যাতন করে খুন করা হচ্ছে। তারপরও এমন মানুষ খুব কমই আছে,
যারা বলতে পারে, তারা কোনোদিনও কোনোভাবে অন্য কারও দ্বারা কষ্ট পায়নি।
সুতরাং, যদিও আমাদের অনেকেই কোনোদিন জানবে না অনাহারে ক্ষুধার যন্ত্রণায়
মরার কষ্টটা কী; নিজের চোখের সামনে নিজের বাড়িঘর ধ্বংস করতে দেখার
অনুভূতিটা কেমন, তথাপি আমার অনেকেই জানি আহত হৃদয়ের কান্নার অনুভূতিটা
কেমন।
আচ্ছা, এসব কি এড়ানো সম্ভব? আমার মনে
হয়, কিছুটা হলেও সম্ভব। আমরা কখনোই সকল দুঃখকষ্টকে এড়াতে পারব না। তবে
আমদের প্রত্যাশা, আমাদের প্রতিক্রিয়া এবং আমাদের মনোযোগকে পরিস্থিতির সাথে
মানিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে অনেক ধ্বংসযজ্ঞই এড়ানো সম্ভব।
উদাহারনস্বরূপ বলা যায়, আমদের আশা, ভরসা, বিশ্বাস — সবকিছুকে অন্য একজন
মানুষের উপর সমর্পণ করাটা একেবারেই অবস্তবিক এবং ডাহা বোকামি। আমদের মনে
রাখতে হবে, ভুল করা মানুষের সৃষ্টিগত স্বভাব। তাই আমাদের চূড়ান্ত বিশ্বাস,
আস্থা, এবং প্রত্যাশা শুধুমাত্র আল্লাহ্র প্রতি সমর্পণ করা উচিত।
আল্লাহ্ বলেন :
“যে ব্যক্তি তাগূতকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহ্র প্রতি ঈমান আনে, অবশ্যই সে মজবুত রশি আঁকড়ে ধরে, যা ছিন্ন হবার নয়। আর আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা এবং সর্বজ্ঞ।” [আল-বাকারাহ্; ২ : ২৫৬]
“আল্লাহ্র প্রতি ঈমান এমন মজবুত এক রশি
যা ছিন্ন হবার নয়।” — শুধু এই কথাটি যদি আমরা স্মরণে রাখি, তাহলে অনেক
অনাকাঙ্ক্ষিত হতাশা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
একথা বলার অর্থ কিন্তু এই নয় যে, আমরা
ভালোবাসবো না বা ভালোবাসলেও কম করে বাসবো। তবে কীভাবে ভালোবাসবো সেটাই হলো
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কাউকেই বা কোনো কিছুকেই সর্বোচ্চ
ভালোবাসা যাবে না। অন্তরে আল্লাহ্ ব্যতীত আর কোনো কিছুকেই অগ্রাধিকার
দেওয়া যাবে না। আর আল্লাহ্ ব্যতীত কোনো কিছুকেই এত বেশী ভালোবাসা যাবে না
যাতে করে ওই বস্তু ছাড়া জীবন চলা আমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই ধরনের
“ভালোবাসা” ভালোবাসাই নয়। এটা এক ধরনের পূজা করা। এই ভালোবাসায় কষ্ট
ছাড়া আর কিছু নেই।
তারপরও যদি কেউ এমন করে ভালোবাসে এবং
অন্যের দ্বারা আঘাত বা কষ্ট পায়, তাহলে অনিবার্য পরিণতিটা কী দাঁড়ায়?
সবচেয়ে কঠিন কাজটা আমরা কীভাবে করতে পারি? কীভাবে আমরা অন্যকে ক্ষমা করতে
শিখব? কীভাবে মনের ক্ষতগুলোকে সারিয়ে তুলে, তাদের সাথে সদাচরণ বজায় রাখব
যারা নিজেরাই আমাদের সাথে ভালো ব্যবহার করে না?
আবূ বাক্র (রা) এর ঘটনাটি ঠিক এমন
পরিস্থিতির একটি চমৎকার উদাহরণ। যখন তাঁর মেয়ে, ‘আয়েশা (রা) সম্পর্কে
জঘন্যতম অপবাদ রটানো হলো, তিনি জানতে পারলেন, এই অপবাদটা রটিয়েছিল
মিস্তাহ্ নামে তারই এক চাচাতো ভাই যাকে তিনি বহুদিন ধরে আর্থিকভাবে
সাহায্য সহযোগিতা করে আসছিলেন। সঙ্গত কারণেই আবূ বাক্র অপবাদ আরোপকারীর
সাহায্য বন্ধ করে দিলেন। সামান্য সময় পরেই আল্লাহ্ নিম্নোক্ত আয়াত
অবতীর্ণ করলেন :
“আর তোমাদের
মধ্যে যারা মর্যাদা ও প্রাচুর্যের অধিকারী, তারা যেন এমন কসম না করে যে,
তারা নিকটাত্মীয়দের, মিসকীনদের ও আল্লাহ্র পথে হিজরতকারীদেরকে কিছুই দেবে
না। আর তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের দোষক্রটি উপেক্ষা করে। তোমরা
কি কামনা করো না যে, আল্লাহ্ তোমাদের ক্ষমা করে দেন? আর আল্লাহ্ বড়ই
ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [আন-নূর; ২৪:২২]
এই
আয়াত শুনেই আবূ বাক্র (রা) বুঝতে পারলেন যে, তিনি নিজেই আল্লাহ্র ক্ষমা
চান। তাই তিনি শুধু সেই লোককে সাহায্য দেওয়া চালুই করলেন না, এখন আগের
চেয়ে বেশি করে দিতে লাগলেন।
মু’মিন হওয়ার মূলেই হলো এইভাবে ক্ষমা করে দেওয়া। এই ধরণের মু’মিনদের বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ্ বলেন :
“আর যারা গুরুতর পাপ ও অশ্লীল কার্যকলাপ থেকে বেঁচে থাকে এবং যখন রাগান্বিত হয় তখন তারা ক্ষমা করে দেয়।” [আশ-শূরা; ৪২:৩৭]
‘আমি নিজেও ভুল করি, অন্যদের কষ্ট দেয়’ —
নিজের সম্পর্কে এই ধরণের সচেতনতা বোধ দ্বারা অন্যকে তাৎক্ষনিকভাবে ক্ষমা
করে দেওয়ার ক্ষমতাটা উদ্বুদ্ধ হওয়া উচিত। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই
বিষয়টির মাধ্যমেই আমাদের বিনম্রতা উজ্জীবিত হওয়া উচিত যে, আমারা প্রতিদিন
পাপ করার মাধ্যমে আল্লাহ্র প্রতি অন্যায় করছি। আল্লাহ্র সাথে তুলনা
করলে মানুষ তো কিছুই না। তারপরও বিশ্বজগতের প্রতিপালক, আল্লাহ্ আমাদের
প্রতিনিয়ত ক্ষমা করে দিচ্ছেন। তাহলে ক্ষমা না করে মানুষকে বেঁধে রাখার
আমরা কে? নিজেরা যদি আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা পাওয়ার আশা করি, তাহলে আমরা
অন্যদেরকে ক্ষমা করতে পারি না কেন? আর এ কারণেই নবী (সা) আমাদেরকে শিক্ষা
দিয়েছেন :
“যারা অন্যের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহ্ও তাদের প্রতি দয়া করবেন না।” [মুসলিম; অধ্যায় ৩০, হাদীস নং ৫৭৩৭]
আল্লাহ্র দয়া লাভের আশা যেন আমাদের
অন্যদের প্রতি দয়া করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং একদিন সেই দুনিয়ার নিয়ে যায়
যা বাস্তবিক অর্থেই নিখুঁত, ত্রুটিহীন, পরিপূর্ণ, অনুপম, অতুলনীয়।
বিষয়ঃ ইসলাম
share on facebook
আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুণ। এই ব্লগে পড়তে কি সমস্যা হয়?আপনার কি টাকা বেশি খরচ হয়ে যায়?
এপ্রিল ফুল কেন বর্জনীয় ?
ණ এপ্রিল ফুল দিবসটির সৃষ্টির সাথে রয়েছে মুসলমানদের করুন ও হৃদয়র্স্পশী
এক ইতিহাস । ১ এপ্রিলের এই ইতিহাস অন্যন্য সকলে জানলেও অনেক মুসলমান না
জানার কারনে এই বিজাতীয় অপসংস্কৃতিকে আপন করে নিয়েছে । তৎকালীন ইউরোপীয়
দেশে স্পেনে মুসলিম সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদ এর নেতৃত্বে ৭১১
দেশে স্পেনে মুসলিম সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদ এর নেতৃত্বে ৭১১
খ্রীঃ ইসলামি পতাকা উড্ডীন হয় এবং মুসলিম সভ্যতার গোড়পত্তন হয় ।
সুদীর্ঘ প্রায় আটশ বছর পর্যন্ত সেখানে মুসলমানদের গৌরবময় শাসন বহাল থাকে ।
কিন্তু পরবর্তীতে আস্তে আস্তে মুসলিম
সম্রাজ্যে ঘুনে ধরতে শুরু
করে এবং মুসলিম শাসকরাও ভোগ বিলাসে গা ভাসিয়ে দিয়ে ইসলাম
থেকে দূরে সরে যেতে থাকে । ফলে মুসলিম দেশগুলোও ধীরে ধীরে মুসলমানদরে হাত
ছাড়া হয়ে তথাকথিত খ্রীস্টানদের দখলে চলে যেতে থাকে । এরই ধারাবাহিকতায় আসে স্পেনের পালা । মুসলিম
শাসনে নেমে আসে পরাজয়ের কাল ছায়া । খ্রীস্টান জগত গ্রাস করে নেয়
স্পেনের ঐতিহাসিক বিজয় পতাকা । এক পর্যায়ে মুসলিম নিধনের লক্ষ্যে
খ্রীস্টান রাজা ফার্ডিন্যান্ড বিয়ে করে পর্তুগীজ রানী ইসাবেলাকে । যার ফলে
মুসলিম বিরোধী দুই বৃহৎ খ্রীস্টান শক্তি সম্মিলিত শক্তি রুপে আত্নপ্রকাশ
করে । রানী ইসাবেলা ও রাজা ফার্ডিন্যান্ড খুঁজতে থাকে স্পেন দখলের সুবর্ণ
সুযোগ । পরবর্তীতে মুসলিম সভ্যতার জ্ঞান বিজ্ঞানের কেন্দ্রস্থল গ্রানাডার
বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে । একপর্যায়ে মুসলমানদের
অসতর্কতার সুযোগে
খ্রীস্টান বাহিনী ঘিরে ফেলে গ্রানাডার তিন দিক । এক মাত্র মহাসমুদ্রই বাকী
থাকে মুসলমানদের বাচার পথ । অবরুদ্ধ মুসলমানগন
কিংকর্তব্যবিমূঢ -় হয়ে
এদিক সেদিক ছুটতে থাকে । মুসলমানদের এই অসহায় অবস্থায় রাজা
ফার্ডিন্যান্ড প্রতারনার আশ্রয় নেয় । তিনি দেশব্যাপী ঘোষনা করে দেন"যারা
অস্র ত্যাগ
করে মসজিদগুলোতে আশ্রয় নেবে এবং সমুদ্র পাড়ে রক্ষিত নৌযানগুলোতে আরোহন করবে তাদেরকে সবরকমের নিরাপত্তা দেওয় হবে"। এমন
বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে মুসলমানগন যেন আশার আল খুজে পায় । সরল মনে
বিশ্বাস করে মুসলমানগন মসজিদ ও নৌযানগুলোতে আশ্রয় গ্রহন করে । কিন্তু
ইতিহাসের জঘন্য প্রতারক রাজা ফার্ডিন্যান্ড তালা লাগিয়ে দেয় মসজিদগুলোতে
এবং মাঝ দরিয়ায় ভাসিয়ে দেয় নৌযানগুলোকে । এরপর বিশ্ব মানবতাকে পদদলিত
করে ঐ মানুষ নামের পশু
ফার্ডিন্যান্ড আগুন লাগিয়ে দেয় মসজিদগুলোর চার
পাশে এবং মধ্যসমুদ্রে ডুবিয়ে দেয় নৌযানগুলোকে । ফলে অগ্নিদগ্ধ ও পানিতে
হাবুডুবু খাওয়া লক্ষ লক্ষ নারি পুরুষ আর নিষ্পাপ শিশুর আত্বচিৎকারে ভারি
হয়ে উঠে স্পেনের আকাশ বাতাশ । মুহূর্তের
মধ্যে নির্মমভাবে নিঃশেষ
হয়ে যায় সাত লক্ষ মুসলমানের তাজা প্রান । আর এরি মধ্যে ইতি ঘটে স্পেনের আটশ বছরের মুসলিম শাসনের, আর পৃথিবীর ইতিহাসে রচিত
হয় মনবতা লঙ্ঘনের নির্মম অধ্যায় । যেদিন এই মর্মন্তিক হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছিল
সেদিন ছিল ১৪৯২
খ্রীস্টাব্দের ১লা এপ্রিল । তখন থেকে মুসলমানদেরকে ধোঁকা দেওয়ার সেই নিষ্ঠুর ইতিহাস স্মরনার্থে খ্রীস্টানরা প্রতি বছর
এপ্রিল ফুল পালন করে আসছে । দুঃখের সাথে বলতে হয়"এপ্রিল ফুল"এর প্রকৃত
ইতিহাস সর্ম্পকে না জানার কারনে আমরা আমাদের পূর্বসূরীদের দুর্ভাগ্যকে
আনন্দের খোরাক বানিয়ে এপ্রিল ফুল পালন করছি । আমরা আর কতকাল
আত্মবিস্মৃত হয়ে থাকব ? নিজেদের ইতিহাস ঐতিহ্য
সর্ম্পকে অজ্ঞতার ধারা আর কতদিন আমাদের মধ্যে বিরাজ করবে । অথচ এই অজ্ঞতাই আমাদের জন্য সবচেয়ে মারাত্নক কাল হয়ে দেখা দিয়েছে ।
আল্লাহ আমাদের সুষ্ঠ বুঝ দান করে সঠিক ইতিহাস জেনে আমল করার তৌফিক দান করুন । আমিন ।
শেয়ার করে সবাই কে জানতে দিন স্পনের মুসলিমদের নির্মম ইতিহাস।
শেয়ার করতে এখানে ক্লিক করুন
বিষয়ঃ ইসলাম
এই ব্লগে পড়তে কি সমস্যা হয়?আপনার কি টাকা বেশি খরচ হয়ে যায়
অমুসলিমদের প্রতি মুসলিমদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত?
প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না
শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু
উত্তর : প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ্র জন্য। অমুসলিমদের প্রতি মুসলিমদের কর্তব্যের মধ্যে অনেকগুলো বিষয় অন্তর্ভুক্ত।
আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুণ। এই ব্লগে পড়তে কি সমস্যা হয়?আপনার কি টাকা বেশি খরচ হয়ে যায়?
প্রশ্ন : একজন
অমুসলিম কোনো মুসলিম দেশে প্রবাসী যিম্মি (মুসলিম শাসনে বসবাসকারী
অমুসলিম) হিসেবে বসবাস করতে পারে। আবার একজন মুসলিম কোনো অমুসলিম দেশে
প্রবাসী হিসেবেও বসবাস করতে পারে। পরিস্থিতি দুটোর যা-ই হোক না কেন, একজন
অমুসলিমের প্রতি একজন মুসলিমের কী ধরণের আচরণ করা উচিত? অমুসলিমদের সম্ভাষণ
জানানো থেকে শুরু করে তাদের বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠান পালন করা সহ, তাদের
সাথে মসুলিমদের চালচলন কেমন হওয়া উচিত, সে ব্যাপারে আমি একটা সচ্ছ ধারণা
পেতে চাই। শুধু কর্মক্ষেত্রে কোনো অমুসলিমকে কি বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করার
অনুমতি আছে? দয়া করে জানাবেন।
উত্তর : প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ্র জন্য। অমুসলিমদের প্রতি মুসলিমদের কর্তব্যের মধ্যে অনেকগুলো বিষয় অন্তর্ভুক্ত।
প্রথমত :
একজন অমুসলিমের প্রতি একজন মুসলিমের প্রথম কর্তব্য হলো, তাকে আল্লাহ্র দ্বীন, ইসলামের দা‘ওয়াত দিতে হবে। ইসলামের
দা‘ওয়াত দেওয়ার পাশাপাশি যতদূর সম্ভব, জ্ঞান নিজের বিশুদ্ধ অনুযায়ী
বাস্তবিক অর্থে ইসলাম কী, সে ব্যাপারে অমুসলিম ব্যক্তিকে বুঝাতে হবে। কারণ
অন্যান্য মুসলিমদের পাশাপাশি কোনো ইহুদী, খ্রিস্টান কিংবা মুশরিকের প্রতি
একজন মুসলিমের সর্বোচ্চ পরিমাণ অনুগ্রহ দেখানো উপায় হলো, তাদেরকে
আল্লাহ্র দ্বীনের দা‘ওয়াত দেওয়া। নবী (সা) বলেছেন :
“যে ব্যাক্তি অন্যদেরকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সে ‘আমলকারীর সমপরিমান সওয়াব পাবে।” [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৮৯৩]
‘আলীকে (রা) খায়বারে প্রেরণের সময় রাসূল
(সা) নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তিনি যেন ইহুদীদেরকে ইসলামের দা‘ওয়াত দেন।
রাসূল (সা) বলেছিলেন :
“আল্লাহ্র
কসম! আল্লাহ্ যদি তোমার মাধ্যমে একজন মাত্র ব্যক্তিকে হিদায়াত দান করেন,
তাহলে তোমার জন্য তা হবে লাল উট (সেরা প্রজাতির উট) থাকার চেয়েও অধিক
উত্তম।”
তিনি (সা) আরও বলেছিলেন :
“যে
ব্যক্তি অন্যদেরকে সঠিক পথের দিকে আহ্বান করে, সে তাদের সমপরিমান সওয়াব
লাভ করবে, যারা সে পথের অনুসরণ করবে। অথচ তাদের কারও সওয়াব থেকে
বিন্দুমাত্র কম করা হবে না।” [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৮৩২]
কাজেই, আন্তরিকতার সাথে একজন অমুসলিমকে
ইসলামের দা‘ওয়াত দেওয়া এবং তার কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছে দেওয়া আল্লাহ্র
নৈকট্য লাভের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপায়।
দ্বিতীয়ত :
কোনো মুসলিম শারীরিক, আর্থিক কিংবা
সম্মান-মর্যাদার দিক থেকে অমুসলিম ব্যাক্তির প্রতি কোনোরূপ অন্যায় করতে
পারবে না। অমুসলিম ব্যক্তি যদি যিম্মি (মুসলিম শাসনাধীনে বসবাসকারী),
মুস্তা’মান (মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় নিরাপত্তাপ্রাপ্ত) কিংবা মু‘আহিদ (যার
দেশের সাথে মুসলিমদের শান্তিচুক্তিতে আবন্ধ) হয়, তাহলে তাকে তার প্রাপ্য
অধিকার দিতে হবে এবং চুরি, বিশ্বাসঘাতকতা বা প্রতারণার মাধ্যমে তার
ধনসম্পদের ক্ষয়ক্ষতি করা যাবে না। তাকে হত্যা করা যাবে না এবং আঘাত করে
শারীরিকভাবে কষ্ট দেওয়া যাবে না। কারণ সে মু‘আহিদ, যিম্মি কিংবা
মুস্তা’মান হওয়ায় ইসলামী শারী‘আহ্ কর্তৃক তার নিরাপত্তা সুরক্ষিত।
তৃতীয়ত :
এমন কোনো কারণ নেই যার ফলে আমরা অমুসলিম
সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য, তাদের কাছে জিনিসপত্র ভাড়া দেওয়া বা তাদের কাছ থেকে
ভাড়া নেওয়া ইত্যাদি কাজগুলো করতে পারবো না। সহীহ হাদীসের বর্ণনা
অনুযায়ী, আল্লাহ্র রাসূল (সা) কাফের এবং মুশরিকদের থেকে জিনিসপত্র
কিনেছেন। আর তাদের থেকে জিনিসপত্র কেনা মূলত তাদের সাথে সম্পর্ক রাখা। তাঁর
(সা) মৃত্যুর সময়েও তাঁর একটি বর্ম একজন ইহুদীর কাছে বন্ধক ছিল। ইহুদীর
কাছে একসময় বর্মটি বন্ধক রেখে রাসূল (সা) তাঁর পরিবারের জন্য খাবার
কিনেছিলেন।
চতুর্থত :
অমুসলিমদেরকে প্রথমে সম্ভাষণ জানানো মুসলিম ব্যক্তির উচিত নয়। নবী (সা) বলেছেন,
“ইহুদী কিংবা খ্রিস্টানদের প্রথমে তোমরা সালাম জানাবে না।” [সহীহ মুসলিম, সালাম অধ্যায়, হাদীস নং ২১৬৭]
তিনি (সা) আরও বলেছেন,
“যদি আহলে কিতাবদের কেউ সালামের (আস্সালামু ‘আলাইকুম) মাধ্যমে তোমাদের অভিবাদন জানায়, তাহলে বোলো, ‘ওয়া ‘আলাইকুম।’” [আল-বুখারি, হাদীস নং ৫৯০১; মুসলিম, হাদীস নং ২১৬৫]
অতএব, নিজে থেকে প্রথমেই কোনো কাফিরকে
সালাম জানানো মুসলিমের উচিত নয়। তবে কোন কাফের, ইহুদী বা খ্রিস্টান যদি
কোনো মুসলিমকে সালাম জানায়, তাহলে রাসূলের (সা) নির্দেশ অনুযায়ী, “ওয়া
‘আলাইকুম” বলে উত্তর দিতে হবে।
ভালো প্রতিবেশী হওয়া মুসলিমদের উপর অমুসলিমদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার।
কাজেই কোনো অমুসলিম আপনার প্রতিবেশী হলে তার প্রতি সদয় হউন। তাকে
কোনোভাবে হয়রানি করবেন না। অসচ্ছল হলে তাকে সাহায্য করুন। উপহার দিয়ে,
সুপরামর্শ দিয়ে তাকে সহায়তা করুন। এতে করে সে ইসলামের সৌন্দর্যে আকৃষ্ট
হবে এবং মুসলমান হওয়ার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠবে। অধিকিন্তু, প্রতিবেশী
হিসেবে আপনার উপর তার অধিকার রয়েছে। রাসূল (সা) বলেছেন,
“জিব্রীল
(আ) প্রতিবেশীর প্রতি সদয় হওয়ার জন্য আমাকে এতটাই তাগিদ দিতে থাকলেন যে,
আমি ভাবলাম, তিনি হয়তো প্রতিবেশীকে আমার উত্তরাধিকারী বানিয়ে ফেলবেন।” [আল-বুখারি ও মুসলিম]
প্রতিবেশী কাফির হলেও প্রতিবেশী হিসেবে
তার অধিকার রয়েছে। প্রতিবেশী যদি কাফির হওয়ার পাশাপাশি আত্মীয়ও হয়,
তাহলে তার অধিকার দ্বিগুন: প্রতিবেশী হিসেবে এবং আত্মীয় হিসেবে।
প্রতিবেশী দরিদ্র হলে তাকে যাকাত না দিয়ে
আর্থিকভাবে সাহায্য করুন। কারণ প্রতিবেশী হিসেবে এই সাহায্য পাওয়ার
অধিকার তার আছে। এই সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন (অর্থের ব্যাখ্যা),
“দ্বীনের
ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে স্বদেশ হতে
বহিষ্কার করেনি, তাদের প্রতি সদ্ব্যবহার ও ন্যায় বিচার করতে আল্লাহ্
তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। আল্লাহ্ তো ন্যায়-পরায়ণদেরকে ভালোবাসেন।” [সূরা মুমতাহিনাহ্, আয়াত-৮]
আস্মা বিন্তে আবি বাক্র (রা) থেকে
বর্ণিত একটি বিশুদ্ধ বর্ণনানুযায়ী, মক্কার মুশরিক এবং রাসূলের (সা) মধ্যে
যুদ্ধবিরতি চলাকালীন তার মা — যে তখনও মুশরিকা ছিল — তার সাথে দেখা করে
সাহায্য চাইলো। মায়ের সাথে তার সম্পর্কের বন্ধনকে বহাল রাখবে কি না, সে
বিষয়ে আস্মা রাসূলের (সা) কাছে অনুমতি চাইলেন। উত্তরে রাসূল (সা)
বলেছিলেন,
“তার সাথে রক্তের বন্ধনকে বহাল রাখো।”
অমুসলিমদের উৎসব-অনুষ্ঠান উদ্যাপনের
ক্ষেত্রে বিধান হলো, কোনো মুসলিম সেগুলোতে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। তবে
তাদের কোনো প্রিয়জন মারা গেলে, সমবেদনা জ্ঞাপন করাতে দোষের কিছু নেই।
যেমন: ‘আল্লাহ্ আপনার ক্ষতিপূরণ করুন’ বা এই জাতীয় সহানুভূতিপূর্ণ কথা
বলা যেতে পারে। তবে মৃত ব্যক্তি কাফির হলে “আল্লাহ্ তাকে ক্ষমা করে দিন”
বা ‘আল্লাহ্ তার উপর দয়া করুন’ ইত্যাদি বলা যাবে না এবং মৃতের জন্য কোনো
দো‘আও করা যাবে না। কিন্তু মৃত ব্যক্তির জীবিত আত্মীয়স্বজনদের ক্ষতিপূরণের জন্য এবং তাদের হিদায়াতের জন্য দো‘আ করা যাবে।
ফাতাওয়া নূর ‘আলা আদ্-দার্ব, ১/২৮৯-২৯১
মূল লেখক : শায়েখ আব্দুল ‘আযীয্ ইবনু বাজ (রঃ) | ভাষান্তর ও সম্পাদনা : 'আব্দ আল-আহাদ
প্রকাশনায় : কুরআনের আলো ওয়েবসাইট
শেয়ার করে আপনি ও হোন ইসলাম প্রচারক।
শেয়ার করতে এখানে ক্লিক করুন ।
শেয়ার করতে এখানে ক্লিক করুন ।
আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুণ। এই ব্লগে পড়তে কি সমস্যা হয়?আপনার কি টাকা বেশি খরচ হয়ে যায়?
ইসলামে পর্দার বিধান
আল্লাহ
তায়ালা নির্দেশ করছেন, ‘তোমরা নারীদের কাছ থেকে যখন কিছু চাইবে, তখন
হিজাবের আড়াল থেকে চাইবে, এটা তোমাদের ও তাদের মনের অধিকতর পবিত্রতার জন্য
খুবই উপযোগী’ (সূরা আল আহজাব : ৫৩). উল্লিখিত আয়াতে ‘হিজাব’ শব্দের অর্থ
হচ্ছে পর্দা বা আচ্ছাদন বা আবৃতকরণ বা ঢেকে নেয়া। নারী-পুরুষের মধ্যে
গায়ের মাহরিমদের জন্য পর্দা করা, এটা আল্লাহ তায়ালার হুকুম বা আইন। এ
হুকুম বা আইন মানা সব প্রাপ্তবয়স্ক
নর-নারীর ওপর ফরজ। যাদের বিয়ে করা হারাম তাদেরকে মাহরিম বলে। আর তাদের
ব্যতীত সবাই গায়ের মাহরিম। গায়ের মাহরিমদের মধ্যে পর্দা বাধ্যতামূলক বা
ফরজ করা হয়েছে, এটা আল্লাহর ইবাদত।
আল্লাহ তায়ালা বলছেন, ‘আমি জিন ও মানুষ সৃষ্টি করেছি শুধু আমার ইবাদতের জন্য’(সূরা আজ জারিয়াত : ৫৬). আরো নির্দেশ হচ্ছে, ‘হে মানুষ, তোমরা আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করো, যিনি তোমাদের ও পূর্ববর্তীদের সৃষ্টি করেছেন’ (সূরা আল বাকারা : ২১). আল্লাহ তায়ালার প্রতিটা হুকুম মেনে চলাই হচ্ছে ইবাদত।
ইবাদতের েেত্র আমাদের কিছু স্বেচ্ছাচারিতা আছে। আমরা কখনো সালাত আদায় করি আবার ছেড়ে দেই, সিয়াম পালন করি আবার ছেড়ে দেই, হজ ফরজ হলেও বিভিন্ন অজুহাতে হজ পালন করি না, জাকাতদাতা হলেও সঠিকভাবে জাকাত পরিশোধ করি না। ঈমানের দাবি পূরণ করা না করা বা ছেড়ে দেয়া প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা হচ্ছে, ‘যারা একবার ঈমান আনল আবার ছেড়ে দিলো বা কুফরি করল, আবার ঈমানের দাবি পূরণ করল আবার ছেড়ে দিলো বা কুফরি করল, এমনিভাবে তারা দিনে দিনে কুফরিকেই বাড়িয়ে দিলো, এমনি করে ঈমান নিয়ে তামাশা করার এ লোকদের আল্লাহ তায়ালা কখনো মা করবেন না, আর তিনি এসব ব্যক্তিকে সঠিক পথও দেখাবেন না’ (সূরা আন নিসা : ১৩৭)।
ঈমানের পর সালাত, সিয়াম, হজ ও জাকাতের মতো প্রাপ্তবয়স্ক নর-নারী নির্বিশেষে সবাই পর্দা পালন করাও গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক ইবাদত। আল্লাহতায়ালা নির্দেশ করেছেন, ‘আর তোমরা ঘরে অবস্থান করবে, পূর্বেকার জাহেলিয়াতের জমানার নারীদের মতো নিজেদের সৌন্দর্য প্রদর্শনী করে বেড়াবে না, সালাত কায়েম করবে, জাকাত আদায় করবে, আল্লাহ ও তার রাসূল সা:-এর আনুগত্য করবে, আল্লাহতায়ালা মূলত এসব কিছুর মাধ্যমে নবী পরিবার তথা তোমাদের মাঝ থেকে সব ধরনের অপবিত্রতা দূর করতে চান’ (সূরা আল আহজাব : ৩৩). আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ হচ্ছে, ‘হে নবী! আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ, এবং মুমিন মহিলাদেরকে বলে দিন, তারা যেন নিজেদের ওপর নিজেদের চাদরের আঁচল ঝুলিয়ে দেয়, এটা তাদের জন্য ভালো নিয়ম ও রীতি, যেন তাদের চিনতে পারা যায় ও তাদের উত্ত্যক্ত করা না হয়’ (সূরা আল আহজাব : ৫৯)।
রাসূল সা: বলেছেন, ‘মানুষ তার সমগ্র ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে জিনা করে। দেখা হচ্ছে চোখের জিনা, ফুঁসলানো কণ্ঠের জিনা, তৃপ্তির সাথে কথা শোনা কানের জিনা, হাত দিয়ে স্পর্শ করা হাতের জিনা, কোনো অবৈধ উদ্দেশ্যে পথ চলা পায়ের জিনা, এভাবে ব্যভিচারের যাবতীয় ভূমিকা যখন পুরোপুরি পালিত হয়, তখন লজ্জাস্থান তার পূর্ণতা দান করে অথবা পূর্ণতা দান থেকে বিরত থাকে’ (বুখারি, মুসলিম ও আবু দাউদ)।
পর্দা নারী-পুরুষ সবার জন্য : ‘(হে! রাসূল সা:) আপনি ঈমানদার পুরুষদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানসমূহের হেফাজত করে, এটাই হচ্ছে তাদের জন্য উত্তম পন্থা, কেননা তারা তাদের চোখ ও লজ্জাস্থান দিয়ে যা করে আল্লাহতায়ালা সে সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গভাবে অবহিত রয়েছেন’ (সূরা আন নূর : ৩০). রাসূল সা: হজরত আলী রা:কে নির্দেশ করছিলেন, ‘হে আলী! নারীদের প্রতি প্রথম দৃষ্টির পর দ্বিতীয় দৃষ্টি নিপে করো না, কেননা প্রথম দৃষ্টি মার যোগ্য দ্বিতীয়টি নয়। হজরত জাবের রা: জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল সা:! হঠাৎ যদি দৃষ্টি পড়ে তা হলে কী করব? রাসূল সা: বললেন, তাৎণিক দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ো’ (আবু দাউদ)।
নারীদের ব্যাপারে নির্দেশ হচ্ছে, ‘ (হে! রাসূল সা:) আপনি ঈমাদার নারীদের বলে দিন তারা যেন তাদের দৃষ্টি নিম্নগামী রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানসমূহ হেফাজত করে, তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে, তবে তাদের শরীরের যে অংশ এমনিই খোলা থাকে তার কথা আলাদা, তারা যেন তাদের বদেশ তাদের মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে রাখে, তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, ছেলে, স্বামীর আগের ঘরের ছেলে, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, তাদের সাথে মেলামেশার মহিলা, নিজেদের অধিকারভুক্ত সেবিকা বা দাসী, নিজেদের অধীনস্থ এমন পুরুষ যাদের মহিলাদের কাছ থেকে কোনো কিছু (যৌন) কামনা করার নেই কিংবা এমন শিশু যারা এখনো মহিলাদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে কিছুই জানে না, এসব মানুষ ছাড়া তারা যেন অন্য কারো সামনে নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, চলার সময় জমিনের ওপর তারা যেন এমনভাবে নিজেদের পা না রাখে, যে সৌন্দর্য তারা গোপন করে রেখেছিল তা তাদের পায়ের আওয়াজে লোকদের কাছে জানাজানি হয়ে যায়’ (সূরা আন নূর : ৩১)।
রাসূল সা: তার স্ত্রী হজরত উম্মে সালমা ও মায়মুনা রা:কে অন্ধ সাহাবা হজরত ইম্মে মাকতুম রা:-এর সাথে পর্দা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন’ (বুখারি ও তিরমিজি)।
মাহরিম সম্পর্কে নির্দেশ : ‘নারীদের মধ্য থেকে যাদের তোমাদের পিতা, পিতামহ বিয়ে করেছে (সৎ মা ও দাদী), তোমরা কখনো তাদের বিয়ে করো না, হ্যাঁ এ নির্দেশ আসার আগে যা হয়ে গেছে তা তো হয়েই গেছে, এটি আসলেই ছিল একটি অশ্লীল ও নির্লজ্জ কাজ এবং খুবই ঘৃণ্য ও নিকৃষ্ট আচরণ’। ‘বিয়ের ব্যাপারে তোমাদের জন্য হারাম করে দেয়া হয়েছে তোমাদের মা, মেয়ে, বোন, ফুফু, খালা, ভাইয়ের মেয়ে, বোনের মেয়ে, আরো হারাম করা হয়েছে সেসব মা যারা তোমাদেরকে বুকের দুধ খাইয়েছে, তোমাদের দুধ বোন, তোমাদের স্ত্রীদের মা, তোমাদের স্ত্রীদের মাঝে যাদের সাথে তোমরা সহবাস করেছ তাদের আগের স্বামীর ঔরসজাত মেয়েদেরকেও হারাম করা হয়েছে, যারা তোমাদের অভিভাবকত্বে রয়েছে, অবশ্য যেসব স্ত্রীর সাথে বিয়ের পর তোমরা সহবাস করোনি, তাহলে তাদের আগের স্বামীর ঔরসজাত মেয়েদের বিয়ে করতে দোষের কিছু নেই, তোমাদের নিজেদের ঔরসজাত ছেলেদের স্ত্রীদেরও আর এক সাথে দুই বোনকে হারাম করা হয়েছে’ (সূরা আন নিসা : ২২-২৩)।
সালাত, সিয়াম, হজ ও জাকাত যেমন ফরজ পর্দাও তেমন ফরজ। সালাত ব্যক্তিকে পবিত্র করে, সিয়াম ব্যক্তিগত তাকওয়া বৃদ্ধি করে, হজ ব্যক্তির আত্মার প্রশান্তি আনে, জাকাত ব্যক্তির মালসম্পদ পবিত্র ও বৃদ্ধি করে। জাকাত আদায় না করলে ধনীর সম্পদে গরিবের যে হক আছে, তা নষ্ট বা আত্মসাৎ করা হয়। কিন্তু পর্দা পালন না করলে ব্যক্তিগত তির সাথে সাথে সমাজও তিগ্রস্ত হয়।
আল্লাহ তায়ালার হুকুম হচ্ছে, পুরুষরা তাদের দৃষ্টি অবনত রাখবে, নারীরা তাদের ঘরে অবস্থান করবে, বের হলেও দৃষ্টি অবনত রাখবে, আপাদমস্তক চাদর দিয়ে ঢেকে নেবে। একটি মাত্র বেপর্দা যুবতী হাজার হাজার পুরুষকে জাহান্নামি বানানোর জন্য যথেষ্ট। হাদিস শরিফে উল্লেখ আছে যে, রাসূল সা: বলেছেন, ‘শয়তানের কাজ হচ্ছে মহিলাদের পুরুষের সামনে সুশ্রী করে উপস্থাপন করা’। রাসূল সা: আরো বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো অপরিচিত নারীর প্রতি যৌন লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাবে, কিয়ামতের দিন তার চোখে উত্তপ্ত গলিত লোহা ঢেলে দেয়া হবে’ (ফাতহুল কাদির). রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে নারী আতর বা সুগন্ধি দ্রব্যাদি ব্যবহার করে লোকদের মধ্যে যায় সে একটি ভ্রষ্টা নারী’।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে বনি আদম, আমি তোমাদের জন্য পোশাকের বিধান পাঠিয়েছি, যাতে করে এর দ্বারা তোমরা তোমাদের গোপন অঙ্গ বা লজ্জাস্থানসমূহ ঢেকে রাখতে পার এবং নিজেদের সৌন্দর্যও ফুটিয়ে তুলতে পার, তবে আসল পোশাক হচ্ছে তাকওয়ার, আর এটাই হচ্ছে উত্তম পোশাক এবং এটা আল্লাহর নিদর্শনসমূহেরও একটি’ (সূরা আল আরাফ : ২৬)।
অতএব ঈমানদারদের উচিত আল্লাহ তায়ালাকে অভিভাবক মেনে ও রাসূল সা:-এর সুন্নাহর অনুসরণ করে, আল্লাহ প্রদত্ত রাসূল সা: প্রদর্শিত পথে চলা। কুরআন ও হাদিসের আলোকে সালাত, সিয়াম, হজ ও জাকাত যেমন ফরজ, পর্দা বা হিজাবও তেমনি ফরজ। আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ করছেন, ‘তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা:-এর কথা মেনে চলো, আশা করা যায় তোমাদের ওপর দয়া করা হবে’ (সূরা আলে ইমরান : ৩২)।
শেয়ার করে আপনি ও হোন ইসলাম প্রচারক
শেয়ার করতে এখানে ক্লিক করুন ।
এই ব্লগে পড়তে কি সমস্যা হয়?আপনার কি টাকা বেশি খরচ হয়ে যায়?
আল্লাহ তায়ালা বলছেন, ‘আমি জিন ও মানুষ সৃষ্টি করেছি শুধু আমার ইবাদতের জন্য’(সূরা আজ জারিয়াত : ৫৬). আরো নির্দেশ হচ্ছে, ‘হে মানুষ, তোমরা আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করো, যিনি তোমাদের ও পূর্ববর্তীদের সৃষ্টি করেছেন’ (সূরা আল বাকারা : ২১). আল্লাহ তায়ালার প্রতিটা হুকুম মেনে চলাই হচ্ছে ইবাদত।
ইবাদতের েেত্র আমাদের কিছু স্বেচ্ছাচারিতা আছে। আমরা কখনো সালাত আদায় করি আবার ছেড়ে দেই, সিয়াম পালন করি আবার ছেড়ে দেই, হজ ফরজ হলেও বিভিন্ন অজুহাতে হজ পালন করি না, জাকাতদাতা হলেও সঠিকভাবে জাকাত পরিশোধ করি না। ঈমানের দাবি পূরণ করা না করা বা ছেড়ে দেয়া প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা হচ্ছে, ‘যারা একবার ঈমান আনল আবার ছেড়ে দিলো বা কুফরি করল, আবার ঈমানের দাবি পূরণ করল আবার ছেড়ে দিলো বা কুফরি করল, এমনিভাবে তারা দিনে দিনে কুফরিকেই বাড়িয়ে দিলো, এমনি করে ঈমান নিয়ে তামাশা করার এ লোকদের আল্লাহ তায়ালা কখনো মা করবেন না, আর তিনি এসব ব্যক্তিকে সঠিক পথও দেখাবেন না’ (সূরা আন নিসা : ১৩৭)।
ঈমানের পর সালাত, সিয়াম, হজ ও জাকাতের মতো প্রাপ্তবয়স্ক নর-নারী নির্বিশেষে সবাই পর্দা পালন করাও গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক ইবাদত। আল্লাহতায়ালা নির্দেশ করেছেন, ‘আর তোমরা ঘরে অবস্থান করবে, পূর্বেকার জাহেলিয়াতের জমানার নারীদের মতো নিজেদের সৌন্দর্য প্রদর্শনী করে বেড়াবে না, সালাত কায়েম করবে, জাকাত আদায় করবে, আল্লাহ ও তার রাসূল সা:-এর আনুগত্য করবে, আল্লাহতায়ালা মূলত এসব কিছুর মাধ্যমে নবী পরিবার তথা তোমাদের মাঝ থেকে সব ধরনের অপবিত্রতা দূর করতে চান’ (সূরা আল আহজাব : ৩৩). আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ হচ্ছে, ‘হে নবী! আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ, এবং মুমিন মহিলাদেরকে বলে দিন, তারা যেন নিজেদের ওপর নিজেদের চাদরের আঁচল ঝুলিয়ে দেয়, এটা তাদের জন্য ভালো নিয়ম ও রীতি, যেন তাদের চিনতে পারা যায় ও তাদের উত্ত্যক্ত করা না হয়’ (সূরা আল আহজাব : ৫৯)।
রাসূল সা: বলেছেন, ‘মানুষ তার সমগ্র ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে জিনা করে। দেখা হচ্ছে চোখের জিনা, ফুঁসলানো কণ্ঠের জিনা, তৃপ্তির সাথে কথা শোনা কানের জিনা, হাত দিয়ে স্পর্শ করা হাতের জিনা, কোনো অবৈধ উদ্দেশ্যে পথ চলা পায়ের জিনা, এভাবে ব্যভিচারের যাবতীয় ভূমিকা যখন পুরোপুরি পালিত হয়, তখন লজ্জাস্থান তার পূর্ণতা দান করে অথবা পূর্ণতা দান থেকে বিরত থাকে’ (বুখারি, মুসলিম ও আবু দাউদ)।
পর্দা নারী-পুরুষ সবার জন্য : ‘(হে! রাসূল সা:) আপনি ঈমানদার পুরুষদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানসমূহের হেফাজত করে, এটাই হচ্ছে তাদের জন্য উত্তম পন্থা, কেননা তারা তাদের চোখ ও লজ্জাস্থান দিয়ে যা করে আল্লাহতায়ালা সে সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গভাবে অবহিত রয়েছেন’ (সূরা আন নূর : ৩০). রাসূল সা: হজরত আলী রা:কে নির্দেশ করছিলেন, ‘হে আলী! নারীদের প্রতি প্রথম দৃষ্টির পর দ্বিতীয় দৃষ্টি নিপে করো না, কেননা প্রথম দৃষ্টি মার যোগ্য দ্বিতীয়টি নয়। হজরত জাবের রা: জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল সা:! হঠাৎ যদি দৃষ্টি পড়ে তা হলে কী করব? রাসূল সা: বললেন, তাৎণিক দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ো’ (আবু দাউদ)।
নারীদের ব্যাপারে নির্দেশ হচ্ছে, ‘ (হে! রাসূল সা:) আপনি ঈমাদার নারীদের বলে দিন তারা যেন তাদের দৃষ্টি নিম্নগামী রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানসমূহ হেফাজত করে, তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে, তবে তাদের শরীরের যে অংশ এমনিই খোলা থাকে তার কথা আলাদা, তারা যেন তাদের বদেশ তাদের মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে রাখে, তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, ছেলে, স্বামীর আগের ঘরের ছেলে, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, তাদের সাথে মেলামেশার মহিলা, নিজেদের অধিকারভুক্ত সেবিকা বা দাসী, নিজেদের অধীনস্থ এমন পুরুষ যাদের মহিলাদের কাছ থেকে কোনো কিছু (যৌন) কামনা করার নেই কিংবা এমন শিশু যারা এখনো মহিলাদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে কিছুই জানে না, এসব মানুষ ছাড়া তারা যেন অন্য কারো সামনে নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, চলার সময় জমিনের ওপর তারা যেন এমনভাবে নিজেদের পা না রাখে, যে সৌন্দর্য তারা গোপন করে রেখেছিল তা তাদের পায়ের আওয়াজে লোকদের কাছে জানাজানি হয়ে যায়’ (সূরা আন নূর : ৩১)।
রাসূল সা: তার স্ত্রী হজরত উম্মে সালমা ও মায়মুনা রা:কে অন্ধ সাহাবা হজরত ইম্মে মাকতুম রা:-এর সাথে পর্দা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন’ (বুখারি ও তিরমিজি)।
মাহরিম সম্পর্কে নির্দেশ : ‘নারীদের মধ্য থেকে যাদের তোমাদের পিতা, পিতামহ বিয়ে করেছে (সৎ মা ও দাদী), তোমরা কখনো তাদের বিয়ে করো না, হ্যাঁ এ নির্দেশ আসার আগে যা হয়ে গেছে তা তো হয়েই গেছে, এটি আসলেই ছিল একটি অশ্লীল ও নির্লজ্জ কাজ এবং খুবই ঘৃণ্য ও নিকৃষ্ট আচরণ’। ‘বিয়ের ব্যাপারে তোমাদের জন্য হারাম করে দেয়া হয়েছে তোমাদের মা, মেয়ে, বোন, ফুফু, খালা, ভাইয়ের মেয়ে, বোনের মেয়ে, আরো হারাম করা হয়েছে সেসব মা যারা তোমাদেরকে বুকের দুধ খাইয়েছে, তোমাদের দুধ বোন, তোমাদের স্ত্রীদের মা, তোমাদের স্ত্রীদের মাঝে যাদের সাথে তোমরা সহবাস করেছ তাদের আগের স্বামীর ঔরসজাত মেয়েদেরকেও হারাম করা হয়েছে, যারা তোমাদের অভিভাবকত্বে রয়েছে, অবশ্য যেসব স্ত্রীর সাথে বিয়ের পর তোমরা সহবাস করোনি, তাহলে তাদের আগের স্বামীর ঔরসজাত মেয়েদের বিয়ে করতে দোষের কিছু নেই, তোমাদের নিজেদের ঔরসজাত ছেলেদের স্ত্রীদেরও আর এক সাথে দুই বোনকে হারাম করা হয়েছে’ (সূরা আন নিসা : ২২-২৩)।
সালাত, সিয়াম, হজ ও জাকাত যেমন ফরজ পর্দাও তেমন ফরজ। সালাত ব্যক্তিকে পবিত্র করে, সিয়াম ব্যক্তিগত তাকওয়া বৃদ্ধি করে, হজ ব্যক্তির আত্মার প্রশান্তি আনে, জাকাত ব্যক্তির মালসম্পদ পবিত্র ও বৃদ্ধি করে। জাকাত আদায় না করলে ধনীর সম্পদে গরিবের যে হক আছে, তা নষ্ট বা আত্মসাৎ করা হয়। কিন্তু পর্দা পালন না করলে ব্যক্তিগত তির সাথে সাথে সমাজও তিগ্রস্ত হয়।
আল্লাহ তায়ালার হুকুম হচ্ছে, পুরুষরা তাদের দৃষ্টি অবনত রাখবে, নারীরা তাদের ঘরে অবস্থান করবে, বের হলেও দৃষ্টি অবনত রাখবে, আপাদমস্তক চাদর দিয়ে ঢেকে নেবে। একটি মাত্র বেপর্দা যুবতী হাজার হাজার পুরুষকে জাহান্নামি বানানোর জন্য যথেষ্ট। হাদিস শরিফে উল্লেখ আছে যে, রাসূল সা: বলেছেন, ‘শয়তানের কাজ হচ্ছে মহিলাদের পুরুষের সামনে সুশ্রী করে উপস্থাপন করা’। রাসূল সা: আরো বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো অপরিচিত নারীর প্রতি যৌন লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাবে, কিয়ামতের দিন তার চোখে উত্তপ্ত গলিত লোহা ঢেলে দেয়া হবে’ (ফাতহুল কাদির). রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে নারী আতর বা সুগন্ধি দ্রব্যাদি ব্যবহার করে লোকদের মধ্যে যায় সে একটি ভ্রষ্টা নারী’।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে বনি আদম, আমি তোমাদের জন্য পোশাকের বিধান পাঠিয়েছি, যাতে করে এর দ্বারা তোমরা তোমাদের গোপন অঙ্গ বা লজ্জাস্থানসমূহ ঢেকে রাখতে পার এবং নিজেদের সৌন্দর্যও ফুটিয়ে তুলতে পার, তবে আসল পোশাক হচ্ছে তাকওয়ার, আর এটাই হচ্ছে উত্তম পোশাক এবং এটা আল্লাহর নিদর্শনসমূহেরও একটি’ (সূরা আল আরাফ : ২৬)।
অতএব ঈমানদারদের উচিত আল্লাহ তায়ালাকে অভিভাবক মেনে ও রাসূল সা:-এর সুন্নাহর অনুসরণ করে, আল্লাহ প্রদত্ত রাসূল সা: প্রদর্শিত পথে চলা। কুরআন ও হাদিসের আলোকে সালাত, সিয়াম, হজ ও জাকাত যেমন ফরজ, পর্দা বা হিজাবও তেমনি ফরজ। আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ করছেন, ‘তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা:-এর কথা মেনে চলো, আশা করা যায় তোমাদের ওপর দয়া করা হবে’ (সূরা আলে ইমরান : ৩২)।
শেয়ার করে আপনি ও হোন ইসলাম প্রচারক
শেয়ার করতে এখানে ক্লিক করুন ।
এই ব্লগে পড়তে কি সমস্যা হয়?আপনার কি টাকা বেশি খরচ হয়ে যায়?
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি
(
Atom
)








